বাচ্চারা দুষ্টুমি করবেই, কিন্তু কোনো কোনো বাচ্চা এমন ডানপিটে যে কিছুতেই বাবা-মা তার সঙ্গে পেরে ওঠেন না। তিন-সাত শতাংশ স্কুলবয়সী বাচ্চার ক্ষেত্রে এমন হয়। এটা একটা অসুখ। যার সংক্ষিপ্ত নাম এডিএইচডি মানে 'অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিজঅর্ডার' বা মনোযোগ ঘাটতিজনিত দুরন্তপনা। এ অসুখে আচরণজনিত তিনটি বৈশিষ্ট্য সাধারণত থাকে।
* অমনোযোগিতা
* দুরন্তপনা
* অদ্ভুত তাড়না।
শৈশবকালে
অমনোযোগী শিশু কদাচিৎ কোনো একটা কাজে মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে। কোনো কাজ শুরু করলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তাতে আর উৎসাহ থাকে না। আগেরটা বাদ দিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্য কোনো কিছুতে। কোনো কিছুতেই স্থিরতা নেই। একমুহূর্তের জন্য সে কোথাও বসে থাকতে পারে না। রুমে বা যেখানে অবস্থান করছে, হয় পা দিয়ে, না হয় হাত দিয়ে সবকিছু সে ছুঁয়ে যাচ্ছে, ঠেসে ধরছে অথবা অনর্গল বকবক করে চলেছে। এটাই এ সময় রোগটির লক্ষণ।
দেখে মনে হয় যেন এক অদ্ভুত তাড়না শিশুটির মধ্যে কাজ করে সব সময়। কোনো কিছু করার আগেই যেন নতুন চিন্তা তার মধ্যে ভিড় করে। ফলে সে কোনো কিছু না দেখে গাড়ি চলাচলের রাস্তায় দৌড়ে চলে যেতে পারে, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে, একা একাই করে ফেলতে পারে বিপজ্জনক কোনো কাজ।
বয়ঃসন্ধিকালে
এডিএইচডিতে ভোগা ৭০ শতাংশ ছেলেমেয়ে বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত হতে হতে উদ্দীপ্ত তাড়নাজাত আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সমস্যার সমাধানে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তালগোল পাকিয়ে ফেলে এবং কৈশোর-যৌবনকালজুড়ে অমনোযোগিতার জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হয়। এ সময় এ অসুখের লক্ষণের মধ্যে থাকে-
* স্কুলে বা বাসায় সাধারণভাবে ছন্নছাড়া সময় পার করে দেওয়া
* যেকোনো কার্যক্রমে দেরিতে অংশগ্রহণ ও তাড়াহুড়ো করে শেষ করার চেষ্টা করা
* নিয়মিতভাবে হোমওয়ার্ক ঠিক সময়ে শেষ করতে না পারা
* কিছুক্ষণের জন্য মনঃসংযোগ দিয়ে কাজ করলেও আবার অন্য কোথাও মন হারিয়ে ফেলা
* সব কাজ একদম শেষ সময়ে সম্পাদন
* তাড়াহুড়ো করে কাজ করলেও নিখুঁত থাকার প্রবণতা
* যখন সে কথা বলে তখন আর কারো কিছু না শোনা।
অসুখের কারণ
এখন পর্যন্ত অসুখটির সঠিক কারণ পাওয়া যায়নি। তবে কিছু গবেষণায় জেনেটিক উপাদানকে দায়ী মনে করা হচ্ছে। আরো কিছু কারণ আছে, সেগুলো হলো-
* মা-বাবার বাচ্চাকে ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারা
* প্রসবকালে কিংবা অন্য দুর্ঘটনায় ব্রেনে অগভীর চোট পাওয়া
* ব্রেনে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি
* মগজের মনঃসংযোগ কেন্দ্রগুলোতে গ্লুকোজের মাত্রা কম থাকা
* গর্ভাবস্থায় ধূমপায়ী বা নেশাগ্রস্ত মায়ের শরীর থেকে ক্ষতিকারক উপাদানে আক্রান্ত হওয়া
* খাবারে সুষম পুষ্টিমান বজায় না থাকা।
চিকিৎসা
এডিএইচডি শিশু তিন উপশ্রেণীতে বিভক্ত
* বাচ্চা মূলত অতিদুরন্ত ও
অতিতাড়িত প্রবৃত্তির
* মূলত অমনোযোগী
* ওপরের দুটোই।
এসব শিশুর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সমন্বিতভাবে করতে হয়। প্রথমে দেখে নিতে হবে শিশু অন্য কোনো অসুখে ভুগছে কি না, যদি ভোগে; তবে তার চিকিৎসা করে নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে নিচের বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে হবে।
এডুকেশনাল প্রোগ্রাম : শিশুকে পড়ালেখা করতে উৎসাহ দিতে হবে। যেকোনো বিষয়ে ভালো করলে তাকে পুরস্কৃত করতে হবে। ভয়ভীতি দেখানো চলবে না। বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। ঠিক সময়ে স্কুলে যাওয়া, হোমওয়ার্ক করা ইত্যাদি বিষয়ে বাবা-মা ও অভিভাবককে সাহায্য করতে হবে।
সাইকোলজিস্ট : কখনো কখনো সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়ে চেকআপ করা ও তাদের পরামর্শ গ্রহণ জরুরি। সাইকোলজিস্টরা সহজেই বাচ্চার মানসিক অবস্থা পরিমাপ করে তার জন্য উপযোগী পদ্ধতি বলে দিতে পারেন।
দৈনন্দিন রুটিন : সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে আবার ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত একটি রুটিন তৈরি করে তা মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। প্রতিটি কাজ একটা নির্দিষ্ট সময়ে শুরু ও শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলে অমনোযোগিতা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
ওষুধ : ইদানীং কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। শিশু নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে এ ধরনের ওষুধ সেবন করানো যেতে পারে।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

