শিশুটি জন্ম নেওয়ার সময় জানা যায়, সে মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠেনি। সে বেড়ে উঠেছিল ডিম্বাশয়ে। ডিম্বাশয়ে শিশু বেড়ে ওঠার ঘটনা খুবই কম। আর তা হলেও শিশুর বেঁচে থাকার ঘটনা বিরল। কিন্তু ফাতেমা আখতার নামে এক নারীর কন্যাশিশুর জন্মের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।নবজাতক ও মা দুজনই সুস্থ রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডিম্বাশয়ে বেড়ে ওঠা শিশুর বেঁচে থাকার কোনো নজির বাংলাদেশে এই প্রথম।ফাতেমা আখতারের বাড়ি গাজীপুরের কামাল বাসুনিয়া গ্রামে। স্বামী মোহাম্মদ আলী একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।৫ আগস্ট ফাতেমার অস্ত্রোপচার করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের আবাসিক সার্জন লুৎফা বেগম লিপি। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক বুঝতে পারেন শিশুটি মায়ের গর্ভে (ইউটেরাস) নেই। শিশুটি মায়ের ডান পাশের ডিম্বাশয়ে ছিল।শিশুটি যে মায়ের ডিম্বাশয়ে ছিল তা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল শনিবার পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, শিশুটি মায়ের ডিম্বাশয়েই ছিল।ফাতেমা ও তাঁর নবজাতককে ৮ আগস্ট ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল। মুঠোফোনে ফাতেমা প্রথম আলোকে জানান, এটি তাঁর দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর পেটের ডান পাশে ব্যথা করত। এ রকম ব্যথা প্রথম সন্তান পেটে থাকতে তিনি অনুভব করেননি। তিনি নিজেও কখনো বুঝতে পারেননি যে শিশুটি গর্ভের বাইরে অন্য কোথাও বেড়ে উঠছে।
বিজ্ঞান কী বলে: স্বাভাবিক গর্ভধারণে নিষিক্ত ডিম্বকোষ গর্ভ বা জরায়ুতে স্থান নেয়। সেখানে ডিম্বকোষ বিভক্ত হওয়ার, শিশুতে পরিণত হওয়ার, শিশু বেড়ে ওঠার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আছে। জরায়ুর বাইরে অস্বাভাবিক গর্ভধারণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘একটোপিক প্রেগনেন্সি’। শতকরা এক ভাগ গর্ভধারণ অস্বাভাবিক হয়। অস্বাভাবিক এক ভাগের মধ্যে শতকরা দশমিক শূন্য পাঁচ (.০৫) ভাগ গর্ভধারণ হয় ডিম্বাশয়ে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডিম্বাশয়ে শিশুর বেড়ে ওঠার মতো জায়গা থাকে না। ৯৯.৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় ফেটে যায়। শিশু মারা যায়, মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। কিন্তু ফাতেমার ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় ফেটে যায়নি। শিশু ডিম্বাশয়ে ৩৭ সপ্তাহ ছিল। জন্মের সময় শিশুর ওজন ছিল আড়াই কেজি। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, জরায়ুতে যে পরিমাণ পানিতে (অ্যামনিওটিক ফ্লুইড) শিশু ভেসে থাকে ডিম্বাশয়ে সেই পরিমাণ পানি ছিল না। স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশও সেখানে ছিল না। রক্ত সঞ্চালনেও কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। সে কারণে শিশুটি কিছুটা অপুষ্টির শিকার।
কী ঘটেছিল: ফাতেমা আখতার ৫ আগস্ট অধ্যাপক নিলুফার সুলতানার অধীনে হাসপাতালে ভর্তি হন। নিলুফার সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির আগে বিভিন্ন পর্যায়ে ফাতেমার পাঁচ দফা আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছিল। প্রত্যেকটিতে শিশুটি জরায়ুতে রয়েছে বলে উল্লেখ ছিল। একই সঙ্গে রিপোর্টগুলোতে একটি টিউমারেরও অস্তিত্ব দেখা যায়। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির পরও আবার আলট্রাসনোগ্রাম করা হয় এবং একই রিপোর্ট পাওয়া যায়।
নিলুফার সুলতানা বলেন, ‘জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ হলেই তা মায়ের জন্য ঝুঁকি। তাই আগে জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলতে বলি আমরা। তবে এ ক্ষেত্রে কেউ তা জানতে পারেনি।’ সন্তান জন্মের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রস্ততি ছিল। আলট্রাসনোগ্রামে যাকে টিউমার ভাবা হয়েছিল, অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায় সেটাই জরায়ু। শিশু বের করার পর গর্ভফুল (প্লাজান্টা) বের হতে সমস্যা হচ্ছিল, তখনই চিকিৎসকেরা আবিষ্কার করেন যে শিশুটি আসলে ডিম্বাশয়ের মধ্যেই ছিল।
নিলুফার সুলতানা বলেন, ‘দেশে কেন, সারা পৃথিবীতে এ রকম ঘটনা সচরাচর ঘটে না। সর্বশেষ ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এ রকম একটি শিশুর জন্মের কথা আমরা জানতে পারি। ওই ক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা আগে জানতে পারেননি যে শিশুটি ডিম্বাশয়ে বেড়ে উঠেছিল।
সূত্র - প্রথম আলো

