‘মুখে মুখেই কবিতা বানাতে পারি। তবে এখনো লিখে রাখি না। বড় হয়ে যখন খুব ভালো কবিতা লিখব, তখন লিখে রাখব।’ আয়েশা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল কথাগুলো, যেন রীতিমতো এক কবি! আয়েশা পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণীতে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মোহিনী আক্তার। ও আবৃত্তি করে শোনাল নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’। সহপাঠী কলি, রিমু, সালমা শুনছে কবিতা আবৃত্তি। এই শিশুরা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পড়ছে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত এই ফাউন্ডেশনে জাতীয় বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্র নামে একটি কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এই কেন্দ্রে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ছাড়াও রয়েছে শ্রবণপ্রতিবন্ধী, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিদ্যালয়। এই চারটি ছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সারা দেশে সরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে আরও ৫৫টি বিদ্যালয়। কিন্তু এসব বিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত। তাই চাইলেও অনেক প্রতিবন্ধী শিশু এখানে ভর্তি হতে পারে না।
সমাজের সব প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষার অধিকার। ২০০৪ সালে সরকার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-২) চালু করার আগে সারা দেশে একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের মাত্র ৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯ ও ২৮ অনুচ্ছেদের বিষয়গুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ানোর রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্বের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা দেখা যায়। সেটারও কারণ বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন। ১৯৯০ সালে দেশে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন জারি করা হয়। এই আইনের ধারা-৩-এ বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যালয় প্রতিবন্ধী শিশুকে ভর্তি করতে বাধ্য নয়। আর এ কারণেই মূলধারার বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক চাইলেও সন্তানকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে পারেন না।
এ রকম একজন অভিভাবক সাজিদা রহমান। তাঁর ছেলে সিয়াম উল করিম একজন অটিস্টিক শিশু। অটিস্টিক শিশুদের অভিভাবকদের সংগঠন প্যারেন্টস ফোরাম ফর ডিফারেন্টলি অ্যাবলড চিলড্রেনের সংগঠক সাজিদা রহমান বলেন, ‘চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছিলেন ছেলেকে মূলধারার স্কুলে ভর্তি করতে। তাকে স্কুলে ভর্তি করাতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। প্রায় ৩০টি স্কুলে গিয়েছি। কেউই ওকে ভর্তি করেনি। পরে ইউনিসেফের সহায়তায় রেড ব্রিক স্কুলে ভর্তি করাই।’
১৯ জুন মিরপুর ১৪ নম্বরে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনে অবস্থিত প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়গুলোতে যাই। সেখানে কথা হয় শ্রবণপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই স্কুলে বর্তমানে ১৪০ জন শিক্ষার্থী আছে। ৬ থেকে ১০ বছরের শিশুদের ভর্তি করানো হয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা ইশারা ভাষা, বোর্ড, মডেল, তালিকা, শারীরিক ভঙ্গিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে। ২০০৯ সাল থেকে এই স্কুলের শিশুরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবং আশার কথা হলো, ওরা শতভাগ পাস করেছে।’
সাইদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘এই শিশুরা মূলধারার শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এদের পক্ষে মূলধারার সিলেবাস আয়ত্ত করা কঠিন। তাই আমাদের দাবি, ওদের জন্য বিশেষ পাঠ্যক্রমের ব্যবস্থা করা হোক।’
সাইদুর আরও জানান, এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল রয়েছে। তাই দূরদূরান্ত থেকে আসা অভিভাবকেরা চান তাঁদের সন্তানকে হোস্টেলে রেখে পড়ালেখা করাতে। কিন্তু হোস্টেলে আসনসংখ্যা অনেক কম। তাই অনেক শিক্ষার্থীই ঢাকায় আত্মীয়স্বজনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করছে। আরও একটি বড় সংকটের জায়গা হচ্ছে, এই বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। তাই এখান থেকে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ঝরে পড়ে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পায়। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, আগে শিক্ষকের পদ ছিল ১০টি। এখনো তা-ই আছে। অথচ এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
সরকার সারা দেশে ৬৪ জেলায় ৬৪টি উচ্চবিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। সেই বিদ্যালয়গুলোতে ১০ জন করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে। এসব বিদ্যালয়ের কয়েকটিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের থাকার জন্য হোস্টেলও রয়েছে।
তবে এই সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার একটা ত্রুটি রয়েছে। এখানে ৬৪টি বিদ্যালয়ই বালক বিদ্যালয়। তাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রীরা ভর্তি হতে পারে না।
প্রতিবন্ধী শিশুদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা হলো জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের পরিচালক নাফিসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ এখন পর্যন্ত সীমিত। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকলেও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাসহ সব বিষয় দেখছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ১৯৯০ সালে সরকার সব শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশুরা মূলধারার বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে পারছে না। এসব বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো অবকাঠামো নেই। শিক্ষকদের প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়ানোর জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নেই। পিটিআইয়ে প্রতিবছর বহু শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে কার্যকর কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।’
নাফিসুর রহমান আরও জানান, তবে অন্য অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। যেমন নতুন যে বিদ্যালয়গুলো নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের উপযোগী শৌচাগার তৈরি হচ্ছে; তাদের চলাচলের সুবিধার জন্য র্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে। তবে সেটা সঠিক আয়তনে বানানো হচ্ছে না।
তিনি জানান, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সার্বিকভাবে পুরো কাঠামোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। তাদের প্রতি ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এই বিশেষ শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র - প্রথম আলো

