চিকিত্সায় অবহেলার প্রতিকারের জন্য বিশেষ দেওয়ানি আদালত গঠনের সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। যেখানে ক্ষতিপূরণ ও আদালতের উদ্যোগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে। এছাড়া অবহেলার বিষয়টি নিরূপণের জন্য চিকিত্সক, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সমন্বয়ে কমিশন গঠন করা যেতে পারে মর্মে সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশন বলেছে, এ ধরনের অবহেলার অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাবার পূর্বে তা নিষ্পত্তির জন্য প্রেস কাউন্সিলের অনুরূপ বাংলাদেশ মেডিক্যাল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তবে সেখানে বিচার না পেলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। সেক্ষেত্রে বিএমডিসির গঠন ও এখতিয়ারে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। একইসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে স্বাস্থ্যসেবার বিধানাবলী যুক্ত এবং আইনে আলাদা আদালত প্রতিষ্ঠা করে অবস্থার উন্নতি করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। চিকিত্সায় অবহেলাসহ চিকিত্সা সেবার মানোন্নয়নের সমস্যা নিরসনে কমিশনের এ সংক্রান্ত সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখছে বলে জানা গেছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিত্সায় অবহেলার শিকার রোগীরা প্রতিকার পাচ্ছে এমন উদাহরণ কম। অন্যদিকে প্রকৃত অবহেলা থাকুক বা না থাকুক রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজনদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন চিকিত্সকরা। চিকিত্সক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা দরকার যাতে উল্লিখিত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমাদের দেশে রোগীর তুলনায় চিকিত্সকের সংখ্যা নিতান্ত অপ্রতুল এবং চিকিত্সা অবকাঠামোও দুর্বল। চিকিত্সা অবহেলা প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশে কিছু বিচ্ছিন্ন আইন থাকলেও কোন পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। ফলে অবহেলার প্রতিকারের জন্য দণ্ডবিধির ৩০৪, ৩০৪-এ, ৩৩৬, ৩৩৭ বা ৩৩৮ ধারায় বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোন আইনের অধীনে মামলার আশ্রয় নেয়া সহজ হয়ে ওঠে না। অপারেশনের পর রোগীর দেহাভ্যন্তরে অপারেশনের কোন যন্ত্রপাতি রেখেই সেলাই করা, সাধারণ অব্যস্থাপনাসহ অনেক অবহেলাই সাধারণ চোখে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রেই এটা সম্ভব নয়। এছাড়া ডাক্তার বা অন্য কোন চিকিত্সা সহকারীর অবহেলা, ভুল বা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করাসহ অন্যান্য বাহ্যিক কারণ যেমন অবকাঠামো, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, ব্যবহূত যন্ত্রপাতি, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দ্বারা শর্তায়িত বা প্রভাবান্বিত হতে পারে।
এসব কারণে চিকিত্সায় অবহেলা পরিমাপের মানদণ্ড কি হবে তা নিরূপণ করা বা কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ তা নিরূপণ করবেন তা নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া কোন কর্তৃপক্ষ বা আদালতের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলার মাত্রা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তবে ১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যে বোলাম মামলার রায়ে বলা হয়েছে, চিকিত্সা পেশায় নিয়োজিত চিকিত্সকরা যে সকল বিষয় জানা স্বাভাবিক এবং জানেন বলে ধরে নেয়া হয় তা তিনি সঠিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন কি-না তা-ই বিবেচনার বিষয়। তবে ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় এক আদালতের রায়ে বোলাম নীতি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, চিকিত্সা বিশেষজ্ঞের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আমরা বলতে চাই, চিকিত্সকদের এক বড় অংশের মতামতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেই অভিযুক্ত চিকিত্সককে অবহেলা দায়মুক্ত ঘোষণা করা যায় না। অপরদিকে ১৯৮২ সালে দক্ষিণ অষ্ট্রেলিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বিশেষজ্ঞ মতামত বা প্রমাণকে অবশ্যই নিবিড় বিচার বিভাগীয় নিরীক্ষাভুক্ত হতে হবে বলে উল্লেখ করে বিচারক বলেছেন, পেশাদার মহল অযৌক্তিক প্র্যাকটিস চালাতে পারে, তবে আদালতের দায়িত্ব হচ্ছে এটি নিরীক্ষা করা এবং নিশ্চিত করা প্র্যাকটিসটি যেন আইনের দ্বারা নির্ধারিত যৌক্তিকতার মানসম্মত হয়। অর্থাত্ এ প্রশ্নের মীমাংসা আদালতই করবে কোন পেশাদারী সংস্থা নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি ১৯৯৩ সালে অষ্ট্রেলিয়ার হাইকোর্ট 'রজার্স বনাম উইটেকার' মামলায় সমর্থন লাভ করেছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আমাদের দেশে আদালতের মাধ্যমে চিকিত্সায় অবহেলার প্রতিকারের আইন খুব বিকশিত হয়নি। দণ্ডবিধির অধীনে মামলার সংখ্যাও নগণ্য। তাছাড়া এ আইনে মামলা নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করে। চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে এ আইনটির অপব্যবহারেরও সুযোগ রয়েছে। এছাড়া চিকিত্সা পেশার বৈশিষ্ট্যের কারণেও অবহেলায় দণ্ডবিধির আশ্রয় নেয়া সবচে ভালো উপায় নয়। তবে ২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে চিকিত্সায় অবহেলার প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ আইনের সাধারণ নীতি চিকিত্সা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপযোগী হিসেবে বিবেচিত নয়। তবে ভারতে ১৯৮৬ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত একটি আইন করা হয়, যার অধীন কোন নির্বাহী সংস্থার মাধ্যম ছাড়াই ঐ আইনের অধীনে গঠিত আদালতের আশ্রয় নেয়া যায়। এ আইনটি প্রথমে কেরালা হাইকোর্ট এবং পরে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে চিকিত্সা সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হয়। এরপর থেকে আইনটি যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
অন্য সুপারিশসূমহ:
কমিশনের সুপারিশে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সক ও চিকিত্সা সহকারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, হাসপাতালসমূহে যথাযথ ব্যবস্থাপনা, চিকিত্সা উপকরণ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিত্সক নিয়োগ, চিকিত্সক ও চিকিত্সা সহকারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম শাহ আলম ইত্তেফাককে বলেন, আন্তরিকভাবে আশাকরি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণীত এবং তা বাস্তবায়িত হলে চিকিত্সক, চিকিত্সা সহকারী, চিকিত্সাপ্রার্থী সকলের স্বার্থ রক্ষা হবে। পাশাপাশি চিকিত্সা সেবার সার্বিক মানোন্নয়ন হবে।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

