বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত ফল। র্যাবের অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিএসটিআই-এর নজরদারী কোন কিছুতেই বন্ধ হয়নি বিষমিশ্রিত ফলমূল বিক্রি। সাধারণ মানুষ অনেকটা জেনে শুনেই যেন বিষপান করছেন। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর ফুটপাত থেকে শুরু করে টঙ্গী, বাদামতলী, কাওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, মিরপুর, কালসী, রামপুরা, উত্তরা এবং গুলশান-বনানীসহ সর্বত্র বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত আম, লিচু, কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমী ফলের পাশাপাশি কলাতেও রাসায়নিক ক্যালসিয়াম কার্বাইড মিশানো হচ্ছে। গত ১৫ দিনে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার কেজি রাসায়নিক মিশ্রিত আম উদ্ধার করেছে। জেল-জরিমানা দেয়া হয়েছে ৭০ জন ব্যবসায়ীকে। তারপরেও থেমে নেই ফল বিক্রেতারা। আম, লিচু এবং কাঁঠালে রাসায়নিক মিশানো হচ্ছেই।
একাধিক ফলবিক্রেতা ও র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, আম ও লিচুর পচন রোধ করতে ফরমালিন মিশানো হয়। আম ও লিচু তরতাজা রাখতে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা ফরমালিন মিশিয়ে বাজারে ফল বিক্রি করতে। এছাড়া অপরিপক্ক আম পাকাতে মৌসুমের শুরুর ২ মাস আগেই গাছ থেকে আম পেড়ে সেই আম ক্যালসিয়াম কার্বাইড মিশিয়ে পাকানো হয় এবং বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু আম কিংবা লিচুতেই নয় পচন রোধ করতে আনারসেও ফরমালিন স্প্রে করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. মিয়ার উদ্দিন তার এক গবেষণায় বলেছেন, ফলের পচন রোধে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সময় বাজার থেকে ফল সংগ্রহ করে রাসায়নিক পরীক্ষা করে তা ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, আম পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথেকন ব্যবহার করা হয়। কলা, কাঁঠাল, পেঁপে পাকাতেও ইথেকনের ব্যবহার বাড়ছে। তিনি বলেন, বাজারে যেসব ফল বিক্রি হচ্ছে সেখান থেকে ফল সংগ্রহ করে উপরিভাগ ধুয়ে নিয়ে পানি পরীক্ষা করলে রাসায়নিক পদার্থের সন্ধান সহজেই পাওয়া যায়। ফরমালিন উদ্বায়ু বলে দীর্ঘ সময় পর তা উবে যায়, কিন্তু ফলের ভিতর প্রবেশ করে তা ক্ষতিকরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় ফলের ভিতর ফরমালিনের প্রয়োগের পরীক্ষা সহজ হয় না বলে তা ধরা পড়াও সহজ হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ফল ব্যবসায়ী ইনকিলাবকে বলেছেন, মূলত পরিবহন খরচের কথা বিবেচনায় রেখেই ফরমালিন মিশানো হয়। কারণ গাছপাকা ফল পরিবহন করলে খরচে পোষাবে না। একই ট্রাকে অধিক পরিমাণ ফল পরিবহন করতে গিয়ে দেখা গেছে দেশের দূর-দূরান্ত এলাকায় পৌঁছাতে সময় বেশি লাগে এবং ফল পচে যায়। এছাড়া আড়ৎ ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ পাইকারী ফল বিক্রেতার ফল পরিবহনের আগে দু’টি বিষয় গুরুত্ব দেন। প্রথমত আড়ৎ-এর স্থান স্বল্পতা এবং একই সাথে ফল পাকে না বলে প্রতিদিন বাছাই করতে বেশি খরচ পড়ে। তাছাড়া ফলের রং সুন্দর করতে এবং পচন রোধ করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্যই ফলে ফরমালিন মিশানো হচ্ছে।
মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর
ফরমালিন ও কার্বাইড মিশানো ফল খেলে মানবদেহে কি ধরনের ক্ষতি হতে পারে তা জানতে গিয়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকে ভয়ঙ্কর তথ্য পাওয়া গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ফরমালিন, হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশানো ফল খেলে পেটের পীড়া, হাচি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ হতে পারে। এছাড়া ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট ও ব্রেনে আক্রান্ত হয়। অনেক সময় কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে মানবদেহের পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্তিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ ও ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। শুধু তাই নয় মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।
বিশিষ্ট চিকিৎসক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ফলে রাসায়নিক ও অন্যান্য কেমিক্যাল মিশানোর ফলে এসব ফল মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু ফরমালিনযুক্ত আম, আনারস ও কাঁঠালই নয়, ফরমালিনযুক্ত দুধ ও মাছও বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুরা শারীরিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, এসব খাবার খাওয়ার ফলে গর্ভবতী মহিলার সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি হতে পারে অর্থাৎ প্রতিবন্ধী বা বিকলাঙ্গ হতে পারে।
র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে ফলে কেমিক্যাল মেশানো প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য ব্যবসায়ী, ফল বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, বাজার থেকে আপেল, মাল্টা কিনে ১০/১৫ দিন পরে দেখা যায় একই রকম আছে। এগুলো দীর্ঘদিন রাখার পরেও পচে না। তিনি বলেন, কেমিক্যাল মিশানোর ফলে এখন আর কলার স্বাদ ও গন্ধ আগের মতো পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, শুধু জেল-জরিমানা করে কাজ হবে না। এজন্য প্রয়োজন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা ও সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন কর্মশালা করতে হবে। সভা-সমাবেশ ও সেমিনার করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য সিটি কর্পোরেশন, ব্যবসায়ী এবং ক্রেতার অধিকার সংরক্ষণ সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সবাইকে বুঝাতে হবে বিষাক্ত ফল খেয়ে আপনার আমার সন্তান ও তথা দেশের মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সূত্র - দৈনিক ইনকিলাব

