পরিচিতি যষ্টিমধু বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর কাণ্ড বহু শাখাবিশিষ্ট, তিন-চার ফুট লম্বা, সরল ও নরম হয়ে থাকে। এর পাতা দণ্ডের উভয় দিকে সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত এবং দণ্ডের অগ্রভাগে একটি পাতা থাকে। এর পাতাগুলো ডিম্বাকৃতির, সবুজ ও মসৃণ। পুষ্পদণ্ডের উভয় দিকে হালকা গোলাপি বর্ণের ফুল ফোটে। এর ফল পডজাতীয় এবং এর প্রতিটি ফলে দুই-পাঁচটি বীজ থাকে। এর মূল বেশ মোটা, গোলাকার ও মিষ্টি স্বাদযুক্ত। কার্যকর জৈব রাসায়নিক উপাদান যষ্টিমধুর প্রধান কার্যকর রাসায়নিক উপাদানটি হলো ট্রাইতারপিনয়েড স্যাপোনিন গ্লিসাইরিজিন (গ্লিসাইরিজিনিক অ্যাসিডের পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম লবণের মিশ্রণ)।
এ ছাড়াও এতে রয়েছে গ্লাবরানিন এ ও বি, গ্লিসাইরেটল, গ্ল্যাবরোলাইড, আইসোগ্ল্যারোলাইড নামে ট্রাইতারপিনয়েড স্যাপেনিন; ফরমোনোনেটিন, গ্ল্যাবরোন, নিওলিকুইরিটিন, হিসপা-গ্ল্যাবরিডিন এ ও বি নামে আইসোফাবন; হারনিয়ারিন, আম্বিলিফেরন নামক কৌমারিন এবং আনোসেরিন, এমাইরিন, স্টিগমাস্টেরল নামক ট্রাইতারপিন স্টেরল ইত্যাদি। আধুনিক গবেষণা ও ঔষধি গুণাবলি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় যষ্টিমধু ব্যবহারের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। আর এত ব্যবহারই আধুনিক কালের গবেষকদের দৃষ্টি এর প্রতি ফিরিয়ে আনে। এ পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত এর ঔষধি গুণাবলির ব্যাখ্যা নিম্নে দেয়া হলো : আলসার প্রতিরোধে যষ্টিমধুতে রয়েছে আলসার প্রতিরোধী ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান।
তাই এটি এসপিরিন-জাতীয় ওষুধের প্রভাবে সৃষ্ট আলসারসহ সব ধরনের আলসার প্রতিরোধ ও নিরাময়ে কার্যকর। যষ্টিমধু গ্যাস্ট্রিক মিউকোসা থেকে মিউকাস রসসহ আলসার প্রতিরোধী অন্যান্য রসের নিঃসরণ বাড়ানোর মাধ্যমে আলসার প্রতিহত করে। শ্বাসনালীর প্রসারণ ও কফ নিঃসরণে যষ্টিমধুতে বিদ্যমান গ্লিসাইরিজিন শ্বাসনালী প্রসারিত করে এবং ভেতরে জমে থাকা কফ নরম করে বের করে দেয়। এটি ফুসফুসের ব্রংকিয়াল পেশির সঙ্কোচন প্রতিহত করে। তাই এটি কণ্ঠস্বরের কর্কশভাব দূর করে এবং যেসব ভাইরাস শ্বসনতন্ত্রের রোগ সৃষ্টি ও অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, এটি সার্স (SARS) রোগ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ভাইরাস প্রতিরোধে যষ্টিমধুতে বিদ্যমান গ্লিসাইরিজিন ভাইরাসের বৃদ্ধি রোধ এবং T-লিস্ফোসাইট ও NK কোষের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যষ্টিমধু আমাদের ইনফুয়েঞ্জা ভাইরাস ও হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করে। যকৃৎ সুরক্ষায় আধুনিক কালের গবেষণায় যষ্টিমধুর যকৃৎ প্রতিরক্ষাকারী গুণের প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষণা থেকে জানা যায়, যষ্টিমধু এসপারটেট এমিনো ট্রান্সফারেজ (AST), এলানিন এমিনো ট্রান্সফারেজ (ALT), ল্যাকটেট ডিহাইট্রোজেনেজের (LDH) এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং আমাদের লিভার বা যকৃৎ সুস্থ রাখে। শুধু তা-ই নয়, এটি আমাদের লিভার বা যকৃৎকে কার্বন-ট্রেটা-কোরাইড (CCl4), ক্যাডমিয়াম (Cd) সহ অন্যান্য বিষাক্ত বস্তুর হাত থেকেও আমাদের রক্ষা করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে যষ্টিমধু আমাদের কোষীয় ও অ্যান্টিবডি নির্ভর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। ফলে আমাদের দুর্বলতা নিরসনে ও রোগ প্রতিরোধে যষ্টিমধু কার্যকর ভূমিকা পালন করে। লোকজ ব্যবহার যষ্টিমধু এক অসাধারণ ভেষজ, যার লোকজ ব্যবহারের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। নিম্নে যষ্টিমধু লোকজ ব্যবহার দেয়া হলো : অপুষ্টিজনিত কৃশতায় পুষ্টিহীনতা বা শরীরের বিপাকজনিত সমস্যায় যারা কৃশতায় ভুগছেন, তারা যদি প্রতিদিন অল্প যষ্টিমধু সেবন করেন, তবে উপকার পাবেন। জণ্ডিসে যারা জণ্ডিসে আক্রান্ত বা আগে জণ্ডিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের সবার আগে ডিম, ঝাল ও তেলজাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে। আর যষ্টিমধু চূর্ণ করে এক গ্রাম মাত্রায় আধাকাপ গরম দুধসহ প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে দু’বার খেতে হবে।
এভাবে পাঁচ-ছয় দিন খেলেই উপকার পাওয়া যাবে। মৃগী রোগে এ রোগের ক্ষেত্রে যষ্টিমধু চূর্ণ এক বা দুই গ্রাম মাত্রায় নিয়ে আধাকাপ পরিমাণ পাকা চালকুমড়ার রসের সাথে মিশিয়ে প্রতিদিন খেতে হবে। এর ফলে ওই রোগাক্রমণ যত তাড়াতাড়ি হচ্ছিল, সেটি আর হবে না। আর দীর্ঘ দিন ব্যবহার করতে পারলে, এ রোগ থেকে রেহাইও পাওয়া যেতে পারে। যৌন অতৃপ্তিতে যারা পরিপূর্ণ যৌনতৃপ্তি পাচ্ছেন না, তাদের যষ্টিমধু চূর্ণ এক গ্রাম মাত্রায় দুধের সাথে মিশিয়ে সকালে ও বিকেলে দু’বার করে দু-তিন সপ্তাহ খেতে হবে।
তবে প্রথম সপ্তাহে একটু সংযত থাকতে হবে। বায়ুজনিত পেট ব্যথায় যাদের পেটে বায়ুজনিত ব্যথা হয়, সে ক্ষেত্রে যষ্টিমধু চূর্ণ দেড়গ্রাম বা দুই গ্রাম মাত্রায় দুই বেলা খাওয়ার আগে পানিসহ খেতে হবে। তিন-চার দিন খাওয়ার ফলেই উপশম হয়ে যাবে। মূত্রাব রোধে বা প্রস্রাব আটকে যাওয়ায় পেট ফাঁপাজনিত কারণে প্রস্রাব তলপেটে জমে আছে কিন্তু বেগ নেই। এ ক্ষেত্রে ২-৩ গ্রাম যষ্টিমধু চূর্ণ ও ৭-৮টি কিশমিশ একত্রে বেটে একটু গরম পানিসহ খেলে তৎক্ষণাৎ প্রস্রাব হবে। ফোড়ায় এ ক্ষেত্রে যষ্টিমধু বেটে প্রলেপ দিলে ফোড়া পাকবে ও ফেটে যাবে। চোখ ঝাপসায় চোখে ঝাপসা দেখতে থাকলে শুকনো আমলকী ২-৩টা ১ গ্রাম পরিমাণ যষ্টিমধুর সাথে নিয়ে একটু থেঁত করে আধাকাপ গরম পানিতে ৫-৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। তার পর দুই-তিনবার সেঁকে সেই পানি দিয়ে চোখ ধুলে কয়েক দিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে যাবে।
সূত্র - দৈনিক নয়া দিগন্ত

