মায়ের চিন্তা
নাতাশা হোসেন, সে খুব ভাল কনডুইট জোড়া লাগাতে ( দেয়ালে ইলেকট্রিকের তারে আবরন দেয়ার
প্লাস্টিকের কভার) পারে। কিন্তু তার মনে অনেক বড় বড় স্বপ্ন। ২৮ বছর বয়সে সে ড্রাগন,
ডাইনোসর, হেভি মেটাল মিউজিক এবং সাহিত্য ভালবাসে। সে ভবিষ্যতে লেখিকা হতে চায়।
নাতাশা অফিসে বসে মূলত কনডুইট জোড়া লাগানোর কাজই করে। তার সাথে একই অফিসে কাজ
করে তার ৬১ বছর বয়সী বাবা, শফিক হোসেন। শফিক সাহেব পূর্বে একটি ইলেক্ট্রনিক
কোম্পানিতে চাকরি করতেন। অবসর নেয়ার পর এখন মেয়ের সাথে একই কোম্পানিতে কাজ
করছেন।
কাজের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে নাতাশা জবাব দেয়, “আমি শুধুজোড়া লাগাই, জোড়া লাগাই আর জোড়া
লাগাই।“
কিন্তুসে কাজ করছে এতেই সে অনেক খুশি।.
জন্মের সময় নাতাশা খুবই দুর্লভ জেনেটিক ডিজিস নিয়ে জন্মায়। জন্মের পর ডাক্তার শফিক হোসেন
এবং তার স্ত্রী সাজেদা হোসেনকে বলেন – তাদের সন্তান কখন হাঁটাচলা করতে পারবে না। এমনকি সে
হয়ত শিশুবয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে পারে।
মেয়ে সম্বন্ধে শফিক সাহেব বলেন – “ যখন ডাক্তার আমাদের নাতাশার অসুস্থতার কথা জানালো তখন
আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ডাক্তার আমাদের ওকে হাসপাতালেই রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমরা
ওকে ঘরে নিয়ে আসি আর আদর ভালবাসার মাঝে ওকে বড় করতে থাকি।“
৪ বছর পর এই দম্পতির আরেকটি সন্তান হয়, নাম লিজা, যার বয়স এখন ২৪। দুর্ভাগ্যজনক
হলেও লিজাও তার বড় বোনের মত একই মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মায়। দুই
বোনই একটি জটিল জেনেটিক্যাল ব্যাধিতে আক্রান্ত এর নাম- “Autosomal Recessive
Microcephaly with Agenesis of the Corpus Callosum”। এই রোগে মানুষের মস্তিষ্কের ২
টি হেমিস্ফিয়ার একটি আরেকটির সাথে যোগাযোগ করতে পারে না।
বর্তমানে শফিক এবং সাজেদা দম্পতির একটাই চিন্তা তাদের অবর্তমানে তাদের সন্তানদের কি
হবে? নাতাশা এবং লিজা ছাড়া তাদের আর কোন সন্তান নেই।
৫৫ বছর বয়সী সাজেদা হোসেন বলেন – “ আমরা কখনোই চাই না আমাদের সন্তানরা আমাদের ছাড়া
একটি দিনও পার করুক। কখনো যেন এমন দিন না আসে। কিন্তুআমরা সবাই জানি এমন দিন আসবে,
আমরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।“
পুরো আমেরিকা জুড়ে ৬৫ বছরের কম বয়সী বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রায় ২০% ই শারীরিক অথবা
মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাদের মাঝে অনেকেই তাদের পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পরও তাদের বাবা মার সাথে
থাকছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাবা মা বৃদ্ধ বয়সেও তাদের সন্তানদের দেখভাল করছেন।
পূর্ণ বয়স্ক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানদের দেখভালের পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা –মা রা আজ
তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত আইন এবং ট্রাস্টের প্রয়োজন
অনুভব করছেন।
এই সম্বন্ধে অ্যাডভোকেট রায়হান আজিজ, যার ২ জন সন্তানের মস্তিষ্কেই সেরেব্রাল পালসি রয়েছে,
বলেন – “ এইসব ক্ষেত্রে বাবা মায়েদেরই প্রয়োজন হয় একজন কোচ অথবা শিক্ষকের, সেখানে বাবা
মায়ের অবর্তমানে তাদের অসহায় সন্তানদের কি হবে এই চিন্তা করা খুবই কষ্টের।“
শফিক এবং সাজেদা হোসেন দম্পতি তাদের মেয়েকে সক্ষম করতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা
চালাচ্ছেন। সময়ের সাথে সাথে নাতাশা অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু সে এখনও নিজে একা
বাঁচার মত সমর্থ হয়ে উঠেনি।
নাতাশা বলেন – “ আমি নিজে একা থাকার চেষ্টা করে দেখেছি। কিন্তুপ্রতিবারই আমি আবার বাবা
মায়ের কাছে ফেরত আসি। আমি তাদের ছাড়া থাকতে পারিনা। “
নাতাশার ছোট বোনের বয়স ২৪ হলেও আচরন ৩ বছরের বাচ্চার মত। ২৪ ঘণ্টাই তার অন্য কারো
সাহায্যের প্রয়োজন হয়।
নাতাশা বলেন- “ আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে অনেক চিন্তায় থাকি।“.
শফিক সাহেব এবং তার স্ত্রী এখন ভবিষ্যতের চিন্তা করছেন। তাদের অবর্তমানে তাদের
সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য কোন উপায় আছে কিনা এই নিয়ে চিন্তা করেন। কিন্তু
কোন সঠিক জবাব বা প্ল্যান তাদের এখনও জানা নেই।
সাজেদা হোসেন বলেন – “প্রতিটি দিন যেন গুনে গুনে পার করছি। প্রতিটি দিনের জন্যই সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ
জানাই। আর তারপর আরেকটি দিনের জন্য তৈরি হই।“

