বয়সকালে স্ত্রী-রোগ
10 March,14
Viewed#: 140
স্ত্রী-রোগ বা গাইনোকলজিকাল ডিজিজ-এর সংখ্যা এবং প্রকার খুব একটা কম নয়। আর বয়স যত বাড়ে এই রোগের সংখ্যাও বেড়ে যায়। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ‘এর কি কোনও প্রতিকারের ব্যবস্থা হয় না’? হয়। কম বয়সের সময়ে বা গর্ভাবস্থার সময় থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিলে এই স্ত্রী-রোগগুলি সংখ্যায় এবং পরিমাণগতভাবে কম হয়।
বয়সকালের স্ত্রী-রোগ কী কী হয়?
বেশিরভাগ বয়স্ক মহিলাদের একটা ধারণা আছে যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোধহয় স্ত্রী-রোগের সম্ভাবনা আর থাকে না। কিন্তু দেখা গেছে অন্যান্য রোগের মতোই বিভিন্ন স্ত্রী-রোগ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে। যেমন প্রচুর পরিমানে যে রোগটি দেখা যায় তা হল ইউটেরাস বা জরায়ুর প্রোলাপ্স। আবার জরায়ু এবং ওভারির টিউমার ও সংখ্যাগতভাবে খুব একটা নগণ্য নয়। এর পরেই ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্সের কথা বলা যেতে পারে অর্থাৎ মূত্রধারণের অক্ষমতা।
উপসর্গ হিসেবে সাধারণত কী কী দেখা যায়?
উপসর্গগুলি এক এক রোগের ক্ষেত্রে এক একরকমভাবে দেখা দেয়। যেমন–
টান ধরা কোমরের ব্যথা নিয়ে দেখা দিতে পারে প্রোলাপ্স, এর সঙ্গে ভ্যাজাইনা দিয়ে কিছু বেরিয়ে আসছে এই অনুভূতিও হতে পারে।
দীর্ঘদিন পিরিয়ড বন্ধের পর রক্তস্রাব হতে পারে ইউটেরাসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে।
তলপেটে ব্যথা হওয়া, ফুলে ওঠা, ভারি ভারি লাগা- ওভারিয়ান টিউমারের সম্ভাবনা থাকতে পারে, আবার অনেক ওভারিয়ান টিউমার আছে যা একেবারেই উপসর্গহীন।
ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স বা মূত্র ধরে রাখার ক্ষমতা- এক্ষেত্রে হাঁচি-কাশির সঙ্গে মূত্র বেরিয়ে আসে বা কিছু ক্ষেত্রে অনেকে মূত্রবেগ ধরে রাখতেই অসমর্থ হন।
এ ক্ষেত্রে রোগীর কখন ডাক্তারের কাছে আসা উচিৎ?
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করে। তাই কোনও সন্দেহ হলেই সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুর কাছে আসা উচিৎ। যেমন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জরায়ু ও ওভারির টিউমারের সম্ভাবনা বাড়ে, মূত্র-ঘটিত সমস্যা বা প্রোলাপ্স-এর ক্ষেত্রে যথাশীঘ্র চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে কিডনির উপর চাপ বাড়ে, হাইড্রোনেফ্রোসিস হওয়াও বিচিত্র নয়। শেষে সার্জারির সাহায্য নিতে হয়। তাই সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে অনেক বড় ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
প্রথমদিকে ধরা পড়লে কিছু ক্ষেত্রে কিছু রোগ পেলভিক ফ্লোর বা শ্রোণিতলের ব্যায়ামের মাধ্যমেই সেরে যায়। সমস্যা দীর্ঘায়িত করে এলে হয়তো সার্জারি ছাড়া বিকল্প কোনও রাস্তা থাকে না। তবে টিউমার ও ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত সার্জারি-ই কাম্য। মূত্র বেগ ধরে রাখার সমস্যায় ওষুধও প্রয়োজন হয়।
প্রতিরোধের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ?
দেখা গেছে, বেশিরভাগ রোগই, আমরা একটু সচেতন হলে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না। বয়সকালের স্ত্রী-রোগগুলি সম্পর্কেও একই কথা বলব। এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রথম থেকেই শুরু করতে হবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা নির্ভর করে আপনি কত তাড়াতাড়ি সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছেন। জরায়ুর প্রোলাপ্স ও ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্সের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুস্থ এবং সবল পেলভিক ফ্লোর মাসলস বা শ্রোণিতলের মাংসপেশী। সেই কারণেই কম বয়স থেকে এই মাংসপেশীগুলিকে সঠিক এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে সবল করে তুলতে হবে।
গর্ভাবস্থা চলাকালীন যেহেতু গর্ভস্থ সন্তানের ওজন মাকে বহন করতে হয় সেই জন্য গর্ভাবস্থা থেকেই করতে হবে পেটের বা অ্যাবডোমিনাল এবং শ্রোণিতলের বা পেলভিক ফ্লোরের ব্যায়াম যাতে পেলভিক মাসলসগুলি সুস্থ এবং সবল থাকে।
পেলভিক ফ্লোরের জন্য নর্মাল ডেলিভারির তুলনায় সিজারিয়ান সেকশন-ই অপেক্ষাকৃতভাবে ভবিষ্যতের জন্য ভাল। সিজারিয়ান সেকশন সঠিকভাবে হলে অর্থাৎ কোনও জটিলতা না থাকলে চার সপ্তাহ পরে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে পারেন এবং ডেলিভারির সময় পেলভিক মাসলস-এর কোনওরকম ড্যামেজ বা ক্ষতি হয় না বলেই প্রোলাপ্স-এর সম্ভাবনাও কম।
ব্রেস্ট ফিডিং হল আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এতে ইউটেরাসও ছোট থাকে আবার ওভারিয়ান ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্বন্ধেও একই কথা। ওবেসিটি বা স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ায়। এবং সবাই এই ব্যাপারে অবগত যে নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন-ই এই ওবেসিটি বা স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ-এর প্রতিরোধের মূল কথা।
ডা. পল্লব গঙ্গোপাধ্যায়
গাইনোকলজিস্ট ও মিনিমালি ইনভেসিভ
পেলভিকফ্লোর সার্জেন
এমআরসিওজি (লন্ডন)
ই-মেল : drpallab@yahoo.com
ফেসবুক : http://facebook.com/drpallab
সূত্র - হেলো টুডে