গর্ভধারন এবং ধুমপান
ধুমপান সবসময়ের জন্য একটি বদ অভ্যাস। গর্ভধারন আর ধুমপান কখনো খাপ খায় না। তবে ধুমপান ছাড়ার জন্য গর্ভধারনকালীন সময়টাকে একটু সচেতনভাবে আপনি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন। আসুন জেনে নেই বিস্তারিত।
ধুমপান সন্তান জন্মদানের ক্ষমতাকে নষ্ট করতে পারে
ধুমপানের ঝুঁকিসমূহ সম্পর্কে আপনি নিশ্চয়ই অবগত - দূর্গন্ধযুক্ত পোষাক আর ত্বকের ভাঁজ থেকে শুরু করে হৃদরোগ আর ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত। আপনি যদি ধুমপায়ী হন আর গর্ভবতী হয়ে থাকেন অথবা গর্ভধারন করতে চান, তবে অবশ্যই আপনাকে ধুমপান ছাড়ার ব্যাপারে মনযোগী হতে হবে। কারন ধুমপান গর্ভধারনকে জটিল করে তুলতে পারে। ধুমপান অনেক সময় জরায়ুর বাইরে গর্ভধারনের মত জটিল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। সাধারনত ফ্যালোপিয়ান টিউবে এটি হয়ে থাকে। আর এটাকে Ectopic Pregnancy বলে।
গর্ভাবস্থায় ধুমপান গর্ভস্থ বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে
গর্ভাবস্থায় ধুমপানে গর্ভস্থ বাচ্চা বিষাক্ত কার্বন মনোঅক্সাইড দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। যা বাচ্চার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহে বাধার সৃষ্টি করে। তামাকের নিকোটিন বাচ্চার হৃদকম্প বা হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে পারে এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া ধুমপান আরো যেসব ক্ষতি করতে পারে তার মধ্যে আছেঃ
যোনীপথে রক্তপাত
যোনীপথ প্লাসেন্টা দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ন ঢেকে যাওয়া, প্রসবের পূর্বেই জরায়ু থেকে প্লাসেন্টার আলাদা হয়ে যাওয়া
কম ওজনসম্পন্ন বাচ্চার জন্ম
বাচ্চার থলি বা ‘এমনিওটিক স্যাক’ এর প্রসবপূর্ব অকাল ছিদ্র যা দিয়ে এমনিওটিক ফ্লুইড বেরিয়ে যেতে পারে। এটি প্রসবের পূর্বে এমনকি গর্ভধারনের ৩৭ সপ্তাহের মাথায় ঘটতে পারে।
নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই প্রসব বেদনা শুরু
অকাল প্রসব
জন্মকালীন সমস্যা নিয়ে বাচ্চার জন্ম যেমন হৃদযন্ত্রের সমস্যা, হাত-পা, মাথার খুলি, পেশি ও অন্যান্য অংগের সমস্যা ইত্যাদি।
গর্ভধারন সমস্যা ও বাচ্চা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা
গর্ভকালীন ধুমপান গর্ভস্থ বাচ্চার আরো যেসব ক্ষতি করে যেগুলো জন্মের পর লক্ষন দেখা দেয় তার মধ্যে আছেঃ
- বাচ্চার হঠাৎ মৃত্যু
- পেটের শুলবেদনা
- এজমা
- শ্বাসযন্ত্রে প্রদাহ
- শৈশবকালীন স্থুলতা ইত্যাদি।
কোন কোন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলেন যে গর্ভকালীন ধুমপান বাচ্চার পরবর্তি জীবনে আবেগ-আচরন উন্নয়ন, ও শেখার আগ্রহকে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি বাচ্চার পরবর্তি জীবনে তার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় পরোক্ষ ধুমপানের ক্ষতি
গর্ভাবস্থায় পরোক্ষ ধুমপানেও গর্ভস্থ বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। ঐসব মহিলা যারা নিজেরা ধুমপান করেন না কিন্তু প্রতিনিয়ত ধুমপান দ্বারা আক্রান্ত হন যা পরোক্ষ ধুমপান হিসাবে বিবেচিত, তাতে তাদের গর্ভধারনে সমস্যা হতে পারে, বাচ্চা নষ্ট হতে পারে। আবার গর্ভবতী হলেও বাচ্চা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে বা কম ওজনের হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় ধুমপান ত্যাগে বাচ্চার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমে
আপনি যদি ধুমপায়ী হন অন্যদিকে সুস্থ-সবল বাচ্চার জন্ম দিতে চান, তা’হলে গর্ভাবস্থায় ধুমপান ছেড়ে দেয়া হবে উত্তম কাজ। আপনি যদি গর্ভের প্রথম চার মাসের মধ্যে ধুমপান ছেড়ে দেন তবে তা কম ওজনের বাচ্চা জন্ম দেয়ার আশংকাকে কমিয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় ধুমপান ছেড়ে দিলে তা অকাল প্রসবের ঝুঁকি কমায়, বাচ্চা নষ্ট হবার ঝুঁকি কমায়, শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি কমায় এবং অন্যান্য জটিলতা কমাতে সহায়তা করে।
গর্ভাবস্থায় ধুমপান ছাড়ার নিরাপদ কৌশল
কোন ঔষধ গ্রহন ছাড়াই গর্ভাবস্থায় ধুমপান ছাড়া সম্ভব। এ ব্যাপারে আপনার ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী আপনাকে ভাল পরামর্শ প্রদান করতে পারবেন। তবে সাধারনভাবে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরন করা যেতে পারেঃ
- আপনি কেন ধুমপান ছাড়বেন তার একটা তালিকা প্রস্তুত করুন। যেমন ধরুন আপনার গর্ভস্থ বাচ্চা নষ্ট হতে পারে।
- ধুমপানের উপকরনসমূহ হাতের নাগালের বাইরে রাখুন-কি ঘরে, কি কর্মস্থলে বা ব্যাগে কিংবা গাড়ীতে।
- এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন যা আপনাকে ধুমপানে উদ্দিপ্ত করতে পারে।
- এমন লোকের সংগ নিন যিনি বা যারা ধুমপান করেন না বা এমন স্থানে ভ্রমন করুন যেখানে ধুমপান নিষিদ্ধ।
- কোন কিছু পাওয়ার জন্য বা খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়া থেকে বিরত থাকুন।
- ধুমপান ছাড়ার পর উইথড্রাল সিম্পটম্প দূর করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শমত ব্যায়াম করতে পারেন।
- এমন কাউকে বেছে নিন যার কাছ থেকে প্রয়োজনে সহায়তা নিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় ধুমপান নিরোধক দ্রব্য ব্যবহার কি নিরাপদ
আপনি যদি গর্ভাবস্থায় ধুমপান ছাড়তে খুব সমস্যায় পড়েন তাহলে ধুমপান নিরোধক দ্রব্য সম্পর্কে আপনার ডাক্তার বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর কাছে জানতে পারেন। যেমন নিকোটিন প্যাচ, নিকোটিন ইনহ্যালার, নিকোয়িন গাম, লজেন্স কিংবা নাকের স্প্রে ইত্যাদি। এগুলোর যেকোনটির ব্যবহার আপনার শিশুকে সিগারেটের ক্ষতি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারে। তবে এগুলো ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই আপনার ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সংগে আলোচনা করুন কিভাবে এর থেকে উপকৃত হওয়া যায় এবং ঝুঁকি কমানো যায়।
ধুমপান ছেড়ে দেয়া বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সহজসাধ্য নয়। একবারের চেষ্টায় তো নয়ই, অনেকবারের চেষ্টায় ভাল ফল আশা করা যায়। মনে রাখবেন, একবার যদি আপনি এটা করতে পারেন তবে তার সুফল ভোগ করবে আপনার পুরো পরিবার।
সৌজন্যেঃ হেলথ প্রায়র ২১।

