শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খুদে সৈনিক
২৮ এপ্রিল, ১৩
Posted By: Healthprior21
Viewed#: 113
জনপ্রতি দুই টাকা চাঁদা দিয়ে বিদ্যালয়ে ওরা হাত ধোয়ার যন্ত্র বসিয়েছে। সবাই শ্রেণীকক্ষের বাইরে জুতা রেখে ক্লাস করে। পোশাক, নখ, চুল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। শুধু শ্রেণীকক্ষ নয়, বিদ্যালয়ের চারপাশও পরিষ্কার রাখে ওরা। এমনকি টয়লেট কিংবা টিউবওয়েলের আশপাশেও ময়লা জমতে দেয় না।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাইল্ড ব্রিগেডের (বাংলায় বলা হয় ছাত্র ব্রিগেড) সাফল্যের কথা এভাবেই তুলে ধরেন মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলার সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসাইন। তাঁর অধীনে রাজনগরে ১৩৫টি ও কমলগঞ্জে ১৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ে ছাত্র ব্রিগেডের কাজকর্মের পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
মোহলাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নে। তমা, মুন্নী, আকবর, জুঁই, হ্যাপী সৌরভরা এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। সবাই আলাদা ক্লাসে পড়লেও তাদের একটি সাধারণ পরিচয় আছে, তারা সবাই ছাত্র ব্রিগেডের সদস্য। এই ব্রিগেডের সদস্যরা এসএইইডব্লিউএবি প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি ব্যবহার-সংক্রান্ত আচরণগত উন্নয়নে কাজ করে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রকল্পটি পরিচালনা করে। বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ব্রিগেড চালু আছে।
শুরুতে এই কর্মসূচি শুধু হাত ধোয়া এবং সুপেয় পানি পান নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে টয়লেট নেই। আবার থাকলেও তা তালাবদ্ধ। শ্রেণীকক্ষ বা বিদ্যালয়ের আঙিনায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। এতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতো। মূলত এসব সমস্যা দূর করতেই ছাত্র ব্রিগেড শুরু করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ যৌথভাবে কাজটি করে এবং এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যুক্ত আছে।
এই প্রকল্পের আওতায় মূল ব্রিগেডটি আরও তিনটি ভাগে ভাগ করা থাকে। এই তিন ভাগের দায়িত্ব হলো বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন। আবার প্রতিটি ভাগে চার থেকে পাঁচটি উপদল থাকে। প্রতিটি উপদলে আটজন করে সদস্য থাকে।
মোহলাল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এদের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য একজন শিক্ষক আছেন, যিনি প্রতি বৃহস্পতিবার ওদের ক্লাস নেন। এ বিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক ব্রিগেডের দলনেতা মুন্নী বেগম। মুন্নী জানায়, এই ব্রিগেডের দায়িত্ব হলো শ্রেণীকক্ষসহ বিদ্যালয়ের আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা; নলকূপের গোড়া ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং পানি যেন না জমে তার ব্যবস্থা করা; শ্রেণীকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড, ময়লার ঝুড়ি ও টয়লেট পরিষ্কার রাখা। শিক্ষাবিষয়ক দলনেতা তমা। ওর দলের কাজ হলো, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার উপকরণ, যেমন চক, ডাস্টার আছে কি না নিশ্চিত করা, ছেলেমেয়েরা বই-খাতা এনেছে কি না তা দেখা, হাত ধোয়ার কৌশল ও সময় জানানো, সহপাঠীদের বই-খাতা গুছিয়ে রাখতে উদ্বুদ্ধ করা। শ্রেণীকক্ষে পড়ার উপকরণ সরবরাহ এবং মাসিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তারা। তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো কমিউনিটিতে এসব বিষয়ে ধারণা দেওয়া। তমা বলল, ‘আমরা ছোটরা বড়দের কোনো কথা বললে সহজেই আমাদের কথা তাঁরা মেনে নেন এবং তা পালন করেন।’
পঞ্চম শ্রেণীর পড়ুয়া সাবিহা স্বাস্থ্যবিষয়ক দলনেতা। প্রথম দিকে সবাই তার ওপর একটু বিরক্ত হলেও এখন সবাই সহযোগিতা করে। তার দলের কাজ হলো টিফিন খাওয়ার আগে সবাইকে হাত ধুতে উদ্বুদ্ধ করা। টয়লেটে সাবান, পানি নিশ্চিত করা এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। সবার দাঁত, নখ, চুল পরিষ্কার আছে কি না, তা দেখা। সাবিহা জানায়, ‘আমি শুধু এখানেই নয়, বাড়িতেও এগুলো তদারক করি।’
এ বিষয়ে আনোয়ার হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, এর মাধ্যমে শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জানার পাশাপাশি এর চর্চা করছে। এ ছাড়া এতে ওদের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং স্বেচ্ছাশ্রমের অভ্যাস গড়ে উঠছে, যা সমাজের জন্য ইতিবাচক।
Source: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-28/news/348282