‘ডিঅক্সি রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৩’র খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ আইন কার্যকর হলে ডিএনএ বিশ্লেষণের ফলাফল যেকোনো আদালতের কার্যধারায় চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ডিএনএ হলো প্রতিটি জীবের বংশগতির ধারক এবং বাহক। বাবা, মার মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে ডিএনএ স্থানান্তরিত হয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে অপরাধীকে শনাক্তকরণ, নিরপরাধ ব্যক্তিকেও দ্রুত খালাস দেয়া, সন্তানের পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ ছাড়াও একাধিক কাজে লাগে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং খরচও কমে।
বাংলাদেশে ২০০৬ সালে ডেনমার্ক সরকারের আর্থিক সহায়তায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি যাত্রা শুরু করেছে। এরপর রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থিত ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে এগুলো এ আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
আইনের খসড়া অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেইজ প্রস্তুত করা হবে। ডাটাবেইজ প্রস্তুত ও সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা অন্য কোন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে পারবে। এ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, এই আইনের আওতায় পরিচালিত ডিএনএ বিশ্লেষণ ফলাফল সংবলিত কোনো দলিল এবং মতামত প্রদানকারী কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞকে সাক্ষী হিসাবে আদালতে যেতে হবে না। দলিল এবং মতামতই ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা যাবে।
জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার ২৩৬টি মামলার আবেদনের প্রেক্ষিতে সাত হাজার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে ডিএনএ বিশ্লেষণের ফলাফল ব্যবহার করে কতটি মামলা নিষ্পত্তি হয় সে তথ্য আর ল্যাবরেটরিকে জানানো হয় না।
আইনের খসড়ায় ‘দেহগত পদার্থ’ বলতে রক্ত, লালা, বীর্য, চুল, হাড়, দাঁত, কোষকলা নমুনা অথবা কোন ব্যক্তির দেহের যেকোনো অংশ থেকে গৃহীত দেহ রস যা ডিএনএ বিশ্লেষণের আওতায় আনা হলে প্রয়োজনীয় ডিএনএ উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে তাকে বুঝানো হয়েছে। ডিএনএ ল্যাবরেটরির সঙ্গে যুক্ত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বা উচ্চপদস্থ (ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত) কোনো কর্মকর্তা ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির জন্য দায়ী থাকবেন।
অনুরোধ জানিয়ে সম্মতি নিতে হবে
খসড়া অনুযায়ী, পুলিশ অফিসার অপরাধের শিকার, সন্দেহভাজন, অভিযুক্ত ব্যক্তি অথবা অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে দেহগত পদার্থ দেয়ার জন্য অনুরোধ করে লিখিত সম্মতি নিতে হবে। এই ধরনের ব্যক্তি শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন বা অক্ষম হলে তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত সম্মতি নিতে হবে। আটককৃত, গ্রেফতারকৃত বা অপরাধের জন্য অভিযুক্তদেরও অনুরোধের কারণ জানাতে হবে। অনুরোধ করার ১২ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে সাড়া না পাওয়া গেলে দেহগত পদার্থ ও নমুনা সংগ্রহে রাজি নন বলে ধরে নিতে হবে। আটক, গ্রেফতারকৃত বা অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি দেহগত পদার্থ দিতে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তার সম্মতি ছাড়াই দেহগত কোষকলা বা পদার্থ সংগ্রহ করার লক্ষ্যে উপযুক্ত কোনো আদালতে আবেদন করতে পারবেন। আদালত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে দেহগত পদার্থ সংগ্রহের জন্য আদেশ দেয়ার পর সেই ব্যক্তি যদি হেফাজতে না থাকেন বা কোন ব্যক্তি আদালতের আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানান, তা হলে সংশ্লিষ্ট আদালত তার কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করতে বা আটক রাখার আদেশ দিতে পারবেন। দেহগত পদার্থ যৌন নিপীড়নের শিকার কোনো ব্যক্তি বা মৃতদেহ থেকে সংগ্রহ করতে হলে একজন ফরেনসিক চিকিৎসক বা মেডিকো-লিগ্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য অনুমোদিত ও যোগ্যতাসম্পন্ন মেডিকেল অফিসারের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে। মেয়ে শিশু বা নারীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে একজন মহিলা পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে শালীনতা ও সর্বোচ্চ সতর্কতা মানতে হবে। নমুনা সংগ্রহের স্থান বাংলাদেশের ভেতরে বা বাইরেও হতে পারবে।
আইনের খসড়ায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি ডিএনএ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং পরিষদের কার্যাবলীর কথা উল্লেখ করা আছে। পরিষদের লিখিত অনুমোদন ছাড়া কোনো ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা বা ডিএনএ সম্পর্কিত কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। লাইসেন্স বাতিলেরও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এ পরিষদকে। তবে লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতাদেশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যেই সরকারের কাছে আপিল করাও বিধান রাখা হয়েছে।
শাস্তি
কোনো ল্যাবরেটরি বা সংস্থা অননুমোদিতভাবে ডিএনএ কার্যক্রম পরিচালনা করলে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ডিএনএ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহকারী আইনে অনুমোদিত নন এমন কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কোন ডিএনএ সম্পর্কিত তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অননুমোদিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ ডিএনএ সম্পর্কিত কোনো তথ্য সংগ্রহ করলে, সংগ্রহিত ফলাফল কারো কাছে হস্তান্তর বা প্রকাশ করলেও একই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ডিএনএ বিশ্লেষণের ফলাফল সংরক্ষণ না করে ইচ্ছাকৃতভাবে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তা ধ্বংস, পরিবর্তন, দূষিত বা জাল করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনে অনুমোদিত নন এমন কেউ ডিএনএ সম্পর্কিত ডাটাবেইজে প্রবেশ করলে এবং ডিএনএ সংগ্রহকারীদের কেউ দায়িত্বে অবহেলা করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া কেউ এ আইনের অধীনে প্রণীত বিধি বা প্রবিধির কোন বিধান লঙ্ঘন করলেও একই শাস্তি পাবেন।
এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য ,অ-আপসযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য হবে। মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নিম্নের কোনো আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত কোনো অপরাধের বিচার করতে পারবেন না। অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলী প্রযোজ্য হবে
সূত্র - natunbarta.com

