অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, যেসব শিশুযাদের নিজেরই অন্যদের থেকে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয় তাদের সাথে কিভাবে কাজ করতে হবে, কিভাবে তাদেরকে সমাজে বসবাসের জন্য আরও উপযোগী করে গড়ে তোলা? পৃথিবীর জনসংখ্যা যত বাড়ছে এই বিশেষ শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। সমাজের শিক্ষক, খেলাধুলার প্রশিক্ষক, গান অথবা নাচের টিচার সবাইকেই এখন কম বেশি এই সকল শিশুদের সাথে কাজ করতে হচ্ছে। আপনার সামান্য একটু সহযোগিতা হতে পারে তাদের অগ্রগতির জন্য একটি মাইলফলক। নিজের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থেকে আজই তাদের মানসিক বিকাশের জন্য উঠে পড়ে লাগুন।
হেলথপ্রায়র২১ এনেছে এই বিশেষ শিশুদেরকে সামাজিক করে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৮টি টিপস। নিজে জানুন এবং আপনার শিশুর আশেপাশের মানুষদের সাথে এই টিপসগুলি শেয়ার করুন, কথা বলুন। সকলের সামান্য একটু ইচ্ছাশক্তি এসব শিশুদের দিতে পারে নতুন জীবন।
১) পারস্পরিক ভাব বিনিময়
সমাজের পূর্ণ বয়স্করা এই বিশেষ শিশুদের দেখলেই তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। তাদের নাম, স্কুল ইত্যাদি ব্যাপারে নানা রকম প্রশ্ন করেন। এই সকল শিশুরা সাধারনত প্রশ্ন অপছন্দ করে, অনেক সময়ই তারা প্রশ্নের উত্তর দেয় না অথবা প্রশ্ন এড়াতে পালিয়ে যায়। বিশেষ শিশুদের সাথে
পরিচিত হওয়ার এই পদ্ধতি একদমই সঠিক নয়। প্রথমত তাদের সাথে আলাপ শুরু করার আগে যথা সম্ভব কোমল ভাষা ব্যবহার করুন। যেকোনো রকমের জোরে কথায় তারা ঘাবড়ে যেতে পারে। তাদের সাথে কথা বলতে প্রথম নিজের পরিচয় দিন। তাকে বলুন আপনি তাকে কিভাবে চিনেন। শিশুদের চাহিদা অনুযায়ী কখনো তার হাত ধরে অথবা তার কাঁধে হাত দিয়ে তার সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। তারপর তাকে ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করুন আপনি তার সাথে কিভাবে কাজ করবেন। তাকে বুঝিয়ে বলুন একসঙ্গে কাজ করলে কাজটি করা অনেক সহজ হবে। কাজটি করার বিভিন্ন ধাপ বর্ণনা করুন। আর কথা বলার সময় যথাসম্ভব তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন।
২) পর্যবেক্ষণ
কোন কোন বিশেষ শিশুআলোচনায় অস্বস্তিবোধ করে, কিন্তুতা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। এটা বুঝার উপায় হচ্ছে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। আচরনে কোন পরিবর্তন আসলে তাকে কিছুটা সময় দিন। যদি নিশ্চিত না হন তাহলে শিশুর বাবা-মা অথবা অন্য অভিভাবকের সাথে আলাপ করুন।
৩) শেখার নিরাপদ পরিবেশ
অনেক সময় বিশেষ শিশুরা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শুধুমাত্র আশেপাশের পরিবেশ এবং মানুষ গুলির ব্যবহারের জন্য। যেমন শিশুরা সুইমিং পুলে সাতার শিখতে গেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে বিশেষ শিশুদের সাঁতার শিখাতে প্রয়োজন অন্য রকম পন্থা। স্বাভাবিক শিশুরাই যেখানে পানিতে ভয়ে নামতে চায় না, সেখানে বিশেষ শিশুরা অন্য শিশুদের দেখে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই তাদের সাঁতার শেখাতে হলে তার চারপাশে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাকে বিশ্বাস করাতে হবে তার শেখার পরিবেশ তার জন্য একদমই নিরাপদ।
৪) নিয়মে শিথিলতা
অন্য বাচ্চারা যা অনায়াসে আয়ত্ত করতে পারে, এই শিশুরা হয়ত সেই একই জিনিস অন্য সবার মত আয়ত্ত করতে পারে না। এমন অনেক সময়ই হয় কোন বিষয়ের শিক্ষক তার শিক্ষার পদ্ধতি কখনো পরিবর্তন করেন না। অনেক সময় শিশুরা কোন ক্লাসে বা ট্রেনিং-এ মা-বাবা ছাড়া যোগদান
করতে ভয় পায়। এক্ষেত্রে শিশুর বাবা মাকেও দলে নিয়ে আসুন। শিশুর সাথে সাথে তার বাবা অথবা মা কেও কাজে নিন। যখন শিশু নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় আসতে আসতে একবার দুবার করে মা অথবা বাবা ছাড়া তাকে শিক্ষা দিন।
অনেক সময়ই এই সকল শিশুরা কথা বার্তায় শিক্ষা গ্রহন করতে বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের জন্য প্রয়োজন হাতে কলমে শিক্ষার। শোনার সাথে সাথে দেখে দেখে শেখা তাদের জন্য বেশি উপযোগী।যদি কোন শিশু খেলাধুলায় ঠিকমত অংশগ্রহন করতে না পারে তার সাথে কাউকে রাখুন তাকে সহযোগিতা করার জন্য। কোন ধর্মীয় বিষয় অথবা ধর্ম ক্লাসে হয়ত কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মানে সে বুঝতে পারছে না, সেক্ষেত্রে তাকে হাতে কলমে কোন খেলা বা কার্টুন অথবা প্রোজেক্টের মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে।
৫) হতে হবে ধৈর্যশীল
বিশেষ শিশুদের সাথে কাজ করার পূর্ব শর্তই হতে পারে ধৈর্যশীল হওয়া। অধৈর্য হলে কখনই তাদেরকে সমাজের উপযোগী করে তোলা যাবে না। তারা যদি শিক্ষা যথা সময়ে ধরতে না পারে তাহলে তাদেরকে পুনরায় বিষয়টি শিখাতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সাথে কাউকে রাখুন তাদেরকে তাদের মত করে বুঝানোর এবং সহযোগিতা করার জন্য। যেসকল কাজ অন্য শিশুরা একবারেই পেরে যায়, এই সকল শিশুরা হয়ত ২ বা ৩ অথবা ৪ বারে পারতে পারে। কিন্তু অধৈর্য হয়ে হাল ছাড়া যাবে না।
৬) ভিজুয়াল, অডিটরি অথবা ইঙ্গিতের মাধ্যমে যোগাযোগ করা
ভিজুয়াল যোগাযোগ হতে পারে বিভিন্ন ছবি, কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে। আপনার সাথে সবসময় ক্যামেরা রাখুন। আপনার শিশুর পছন্দের জায়গা, বিষয় ইত্যাদির ছবি তুলে রাখুন। যেসব বিষয়গুলি সে ভুলে যায় তার ছবি অথবা কার্টুন আকারে বা কথা আকারে কার্ডে লিখে রাখুন। তাকে মনে করাতে এগুলি ব্যবহার করুন। শিশুদের তালি, বাঁশি, গান ইত্যাদি ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ করতে সহায়তা করুন। যেমন - বাঁশির শব্দ শুনলে সে খেলা বন্ধ করবে। এভাবে শব্দের মাধ্যমেও তার কাজ করার পদ্ধতি অনেক সহজ করে তোলা যায়। ইঙ্গিতের মাধ্যমে যোগাযোগেও এই সকল শিশুরা সাড়া দেয়। শিশুর কাঁধে হাত রাখা, কোন কিছুতাকে দেয়া, তাকে আঙ্গুল দিয়ে কিছুদেখানো ইত্যাদিও হতে পারে তাকে কাজ কর্মে লিপ্ত করার পদ্ধতি।
৭) রাখুন প্ল্যান এবং ব্যাক-আপ প্ল্যান
সবসময়ই শিশুকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে রাখুন প্ল্যান। আর যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে আপনার শিশুর কাজ ভেস্তে জেতে পারে, সে ভয় পেতে পারে। তাকে শান্ত করতে কাজ পুনরায় শুরুকরতে যেকোনো পরিস্থিতির জন্যই রাখুন ব্যাক-আপ প্ল্যান। শিশুদের শেখানোর সময় মাথায় রাখুন তারা কতটা শিখতে পারছে নাকি কতটা দিতে পারছে।
৮) বি পজিটিভ
পজিটিভ অথবা সহযোগিতামুলক আচরণ করা এইসকল শিশুদের সাথে কাজ করার পূর্ব শর্ত। এই একটি গুন থাকলেই যেকোনো মানুষই এই শিশুদের নিয়ে অনেক সহজেই কাজ করতে পারেন। অনেক সময় অনেক শিক্ষিত মানুষও এই সকল শিশুদের প্রতি পজিটিভ আচরণ দেখাতে ভুলে যান। তাই মানুষ বুঝে সুস্থ পরিবেশে এই সকল শিশুদের রাখুন যেন তারা আর দশ জন শিশুর মতই বেড়ে উঠতে পারে।
Source - friendshipcircle

