ভবিষ্যতের চিন্তায় আহত শ্রমিকেরা
২৯ এপ্রিল, ১৩
Posted By: Healthprior21
Viewed#: 134
দিনাজপুরের ভাদুরিয়া গ্রামের শাপলা বেগমের (২০) জায়গা হয়েছে জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) দোতলায়। রানা প্লাজার ঘটনায় তাঁর বাঁ হাত থেঁতলে যায়। প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকেরা পুরো হাত কেটে ফেলেছেন। কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে, শাপলা জানেন না। চিকিৎসকেরাও তা বলতে পারছেন না।
গতকাল রোববার নিটোরের পরিচালক খন্দকার আবদুল আওয়াল প্রথম আলোকে বলেন, আহত ব্যক্তিদের ৫৫ জন এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি আছেন। প্রাণ বাঁচাতে দুজনের হাত এবং চারজনের পা কাটতে হয়েছে। বাকিদের অধিকাংশই জটিল (ক্রিটিক্যাল) রোগী। কত দিনে তাঁদের চিকিৎসা শেষ হবে, তা নিশ্চিত বলতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে হাসপাতালে যাঁরা আছেন, তাঁদের জীবনের ঝুঁকি কম।
আপাতত প্রাণের ঝুঁকি না থাকলেও শাপলার জীবিকার ঝুঁকি আজীবনের জন্য নিশ্চিত হয়ে গেছে। এক ছেলে নিয়ে অজানা ভবিষ্যৎ এখনই তাঁকে চেপে ধরেছে। হাসপাতাল তাঁকে ছাড়তে হবে। ‘তখন কী করবেন’—এমন প্রশ্নের উত্তরে কেটে ফেলা হাতের দিকে তাকিয়ে শাপলা বলেন, ‘কীভাবে কাজ করব!’
শাপলার মতো পরিস্থিতি ময়মনসিংহের রামপুরের রোজিনার (২৫)। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে ডান হাতে মাথা রেখে বসে ছিলেন রোজিনা। রানা প্লাজার তিনতলার একটি পোশাক কারখানায় অপারেটরের কাজ করতেন। মাসে বেতন ছিল পাঁচ হাজার টাকা। ইচ্ছা ছিল স্বামী আর নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে গ্রামে জমি কিনবেন। ভবনধসের দুদিন পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। জীবন বাঁচাতে তাঁরও বাঁ হাত কাটা হয়েছে। বললেন, ‘কপালে নেই বলে এ জীবনে আর বাড়িঘর হবে না।’ ‘চলবেন কীভাবে?’ উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ যেভাবে চালায়।’
ঢাকা মেডিকেলের এ ওয়ার্ডে সাভারের ঘটনায় আহত পোশাকশ্রমিক আছেন আরও ১৫ জন। রাজবাড়ী জেলার গঙ্গাপ্রসাদপুরের ঝরনা বেগম (২০) তাঁদের একজন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে গেছে, বিশেষ করে ডান পা, তাতে অনুভূতি নেই। কোমর নাড়াতে পারেন না, প্রস্রাব বন্ধ। চিকিৎসকেরা বলছেন: ‘ক্রাশ সিনড্রম’। তিনতলার পোশাক কারখানায় হেলপারের কাজ করতেন। ছোট বোন আন্নাকে নিয়ে থাকতেন সাভারের সবুজবাগ এলাকার একটি মেসে। একই কারখানায় আন্না (কারখানায় নাম ছিল ময়না) অপারেটরের কাজ করতেন। পাঁচ দিনেও আন্নার খবর মেলেনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিটোর ও ঢাকা মেডিকেলে আহত ব্যক্তিদের দেখতে গিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকও গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আহত প্রত্যেককে একটি শাড়ি বা লুঙ্গি এবং ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়।
ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এক হাজার ৫৮০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় ২০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ৯৪৭ জন। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৪৯৩ জন।
দুপুরে ঢাকা মেডিকেলে ব্রিফিংয়ে ভর্তি রোগীদের জটিলতা, চিকিৎসার মেয়াদ ও ব্যয় সম্পর্কে রুহুল হক সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধারকাজ শেষ হলে সব রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হবে। তখনই চিকিৎসার মেয়াদ বলা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আছে। বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হচ্ছে।
ঘটনার ভিড়ে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে রানা প্লাজার হত্যাকাণ্ড নজরের বাইরে চলে যাবে, গণমাধ্যমও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। দীর্ঘ মেয়াদে আহত ব্যক্তিরা কোথায় সহায়তা খুঁজবেন? এর উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যাঁদের যে চিকিৎসা যত দিন দরকার, তত দিন তা বিনা মূল্যে দেওয়া হবে। এ কাজের সমন্বয় করবে ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ (হটলাইন: ০১৭৫৯-১১৪৪৮৮; ফোন: ০২-৮৮১৯৩৫৩; ই মেইল: controlroomdghs@yahoo.com; nhcmc.dghs@gmail.com)। হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পরও ভবিষ্যতে প্রয়োজনে তাঁরা এখানে যোগাযোগ করতে পারবেন।
source:http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-29/news/348585