বিশ্বের গড় আত্মহত্যা লাখে ১৪.৫, অথচ আমাদের দেশে তা লাখে ৮-১০ জন। ২০০২ সালের জরিপ অনুযায়ী আমাদের পাশের দেশ শ্রীলঙ্কায় আত্মহত্যার হার লাখে ৫৫ জন, ভারতে ১০.৫ জন। জাপানে এ সংখ্যা লাখে ২৫.২ জন, তাইওয়ানে ১৩.৫ জন এবং আমেরিকায় ১০.৭ জন। কে কী কারণে আত্মহত্যা করে তা আত্মহত্যাকারী যেমন সব সময় বলে যায় না, তদ্রƒপ অন্যান্য তথ্য থেকেও উদঘাটন করা কঠিন। আত্মহত্যাকারীদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন তথ্য, নমুনা, নথি কিংবা আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে যেসব কারণ জানা যায়, তা হচ্ছে পারিবারিক ও বৈবাহিক সমস্যা, শারীরিক ও মানসিক রোগ, প্রেমে বিফলতা, যৌতুক যন্ত্রণা, পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব, অবৈধ যৌনকর্ম, অবৈধ সন্তানধারণ ও সঠিক শিক্ষা বা মূল্যবোধের অভাব। সাধারণত আমাদের দেশে এসব কারণেই লোকজন আত্মহত্যার মাধ্যমে বিভিন্ন জ্বালা বা যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্ত করে চিরদিনের জন্য। মানসিক রোগীর মধ্যে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। বিষণœ রোগীর ৪৬.২ শতাংশ, ব্যক্তিত্বে সমস্যার রোগীদের ৭.৭ শতাংশ, নেশাকারীদের ৩.৮ শতাংশ, সিজোফ্রেনিয়ার ২.৮ শতাংশ লোক আত্মহত্যা করে। এসব রোগীর সঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে আত্মহত্যার হার অনেক কমে যায়। শারীরিক রোগীর মধ্যে মৃগী রোগীরা ৩.৮ শতাংশ, গ্যাস্ট্রিক রোগীরা ২.৯ শতাংশ, প্রস্রাবে যন্ত্রণা, কোমরে ব্যথার রোগীরা ২.৯ শতাংশ, যৌন সমস্যা ও মাথা ব্যথার রোগীরা ১.৮ শতাংশ আত্মহত্যা করে। এসব শারীরিক রোগীদেরও সঠিক চিকিৎসা হলে আত্মহত্যার হার কমে আসবে। আমাদের দেশে ঝিনাইদহে আত্মহত্যার হার খুব বেশি। লাখে ২৯ জন; যা আমাদের দেশের গড় আত্মহত্যার প্রায় তিন গুণ। এর কারণ খুব স্পষ্ট নয়। তবে ওই এলাকায় আত্মহত্যার জরিপকারীরা আত্মহত্যার এ ব্যাপক পার্থক্যের কারণ হিসেবে যা বলেন তা হচ্ছেÑ সীমান্ত এলাকা হিসেবে এক ধরনের অস্থিরতা এলাকায় সর্বদাই বিরাজমান, চোরাচালান ও চোরাকারবারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিরোধ এখানে লেগেই থাকে, আত্মহত্যার সঠিক রিপোর্ট আগ থেকেই হয়ে আসছে; যা অন্যান্য এলাকায় হয় না, একজনের আত্মহননের ঘটনা অন্যকে এ কাজে উৎসাহিত করে এবং সহজেই এ পথটাকে আত্মহননের পথ হিসেবে বেছে নেয় যাকে ‘সোস্যাল ইমিটেশন’ বলে। যশোর-ঝিনাইদহে এখনো আত্মহত্যার হার অন্যান্য জেলার দ্বিগুণেরও বেশি। আত্মহত্যা পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত দুই ভাবেই হয়ে থাকে। আত্মহত্যার আগে অনেকেই পরিচিত জন অথবা আশপাশের লোকদের তার ইচ্ছার কথা জানায়। কেউ মাসাধিক ধরে প্রস্তুতি নিয়ে এ কাজ করে। কেউ আত্মহত্যা করার পাঁচ মিনিট আগেও জানে না যে সে এ কাজ করবে। কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে হঠাৎ করে রাগের মাথায় সে এ কাজ করে ফেলে। এটিকে অপরিকল্পিত ও ‘ইমপালসিভ সুইসাইড’ বলে। অনেকে মরার ইচ্ছা নিয়েই এ কাজে ঝাঁপ দেয়। হয় কেউ দেখে ফেলার কারণে অথবা দুর্বল কোনো মাধ্যম অবলম্বনের কারণে এরা বেঁচে যায়। আবার বিপরীতও হয়। বাবা-মা বা পরিবারের কারো সাতে রাগ করে ঘুমের বড়ি কিংবা অন্য কোনো দুর্বল মাধ্যম বেছে নিয়ে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দেয় অনেকেই। এরা আসলে মরতে চায় না। এমন একটা ঘটনার মাধ্যমে তার দাবিদাওয়া আদায় করতে চায়, সবার নজর কাড়তে চায়। দেখা গেল সত্যি সত্যি এদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করছে। আমাদের দেশে ১১-২৫ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৭৪.৬১ শতাংশ। এ ছাড়াও চল্লিশ পঞ্চাশের লোকজন, বৃদ্ধ এরাও আত্মহত্যা করে। আমাদের দেশে মহিলারা (৭৩.৪৫ শতাংশ) এবং গৃহিণীরা (৬২.৮৮ শতাংশ) আত্মহত্যা করে, অথচ অন্যান্য দেশে পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করে এবং তালাকপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তরা, বিচ্ছেদপূর্ণ জীবনযাপনকারীরা, বেকারেরা বেশি আত্মহত্যা করে। আমাদের দেশে বিবাহিতদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও অন্যান্য দেশে অবিবাহিত বা সিঙ্গেল যারা তারা বেশি আত্মহত্যা করে। আমাদের দেশে অশিক্ষিতরা (৬৯.৫৬ শতাংশ) আত্মহত্যা করে বেশি অন্যান্য দেশে পেশাজীবী (চিকিৎসক, আইনজীবী, নির্বাহীরা) বেশি আত্মহত্যা করেন। আমাদের দেশে বিষপানে আত্মহত্যা করে বেশির ভাগ লোক (৫৮.৪৬ শতাংশ)। বিষের মধ্যে পোকামাকড় মারার ওষুধ, ধুতুরা, মদ, ঘুমের বড়ি সবই আছে। আছে স্পিরিট, বাংলা মদ। গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যাও আমাদের দেশে কম নয় (৪০.৯০ শতাংশ)। গুলি করে আত্মহত্যা করে আমাদের দেশে খুব কম, যা পাশ্চাত্যে অনেক বেশি। উঁচু থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার ঘটনা আমাদের দেশে বিরল নয়। গ্রামগঞ্জ এমনকি শহরেও উল্লিখিত ‘বিষ’ সহজেই পাওয়া যায় হাতের কাছে; তাই এ মাধ্যমই আমাদের দেশে জনপ্রিয়। আত্মহত্যা হোক কি না হোক, কেউ আত্মহত্যার জন্য চেষ্টা করলেই এটি আইনের চোখে দণ্ডনীয়।
সূত্র - dailynayadiganta.com

