১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে এলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে একটি বক্তৃতা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে তৎকালীন ছাত্র হিসেবে আমি প্রথম প্রশ্নটি করেছিলাম, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কবে আমরা বাংলাদেশের জন্য পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যনীতি এবং স্বাস্থ্যসংস্কার পাব?’
যদিও এর উত্তর ছিল ‘আমরা অচিরেই তা পাব’ এবং তৎকালীন সরকার এবং পরবর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু প্রকৃত সংস্কার রয়ে গেছে সুদূরপরাহত। ১৯৯৬ সালে এই প্রশ্নটি ছিল সময়োপযোগী প্রশ্ন, এখনো তাই আছে। কারণ, সে সময়ের মাত্র এক বছর আগে ১৯৯৫ সালে হার্ভার্ডের ‘ডেটা ফর ডিসিশন মেকিং’ প্রকল্প থেকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়, যাতে বলা হয়েছিল ‘স্বাস্থ্য খাতে স্থায়ী-টেকসই, উদ্দেশ্যমূলক-পরিকল্পিত এবং মৌলিক পরিবর্তন’কে ‘হেলথ সেক্টর রিফর্ম’ বা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার হিসেবে ধরা হবে।
হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথে পড়ার সুবাদে যে কয়েকজন বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য-অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকের কাছে থেকে সরাসরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এঁদের মধ্যে পিটার বারম্যান, ক্রিস্টোফার মুরে, উইলিয়াম হাশিও অন্যতম। আমার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের পর্যালোচনাটি এঁদের কাজের অনেক ধারার সঙ্গেই সমসুরের হবে বলে মনে করি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতিতে কিছু পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারও হয়েছে, কিন্তু তা কোনোভাবেই ‘স্থায়ী-টেকসই, উদ্দেশ্যমূলক পরিকল্পিত এবং মৌলিক পরিবর্তন’ হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না। তারপরও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সফলতা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। সমসাময়িক ‘গ্লোবাল হেলথ’-এর উদ্যোগ বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য—এমডিজি নির্ধারিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশ দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, টিকাদান, মাতৃমৃত্যু হার কমানো এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেয়েছে। বিশেষ করে ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বিগত দুই দশকের সফলতার নিদর্শন। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্নভাবে সফলতা আনলেও উপরোক্ত সংস্কারের লক্ষণ হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার বিষয়টির গভীরে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য খাত বলতে কী বুঝায় এবং সেখানে কী কী গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান জড়িত থাকে তা দেখে নেওয়া জরুরি।
এক.
সরকার: যারা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করে, অর্থসংস্থান করে এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণ করে।
দুই.
স্বাস্থ্যসেবাদানকারী: এরা সরকারি, বেসরকারি, এনজিও বা সনাতন প্রতিষ্ঠান যারা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। যেমন হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি।
তিন.
সম্পদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ: এরা স্বাস্থ্য খাতের জন্য মানবসম্পদ, অন্যান্য গবেষণালব্ধ বস্তুগত সম্পদ সরবরাহ করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য, নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা এবং উন্নয়নমূলক সংস্থা অন্তর্ভুক্ত।
চার.
প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা: সাধারণ মানুষের জন্য বা বিশেষ কোনো দলভুক্ত মানুষের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা কিনে থাকে, যেমন স্বাস্থ্যবিমা বা হেলথ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, হেলথ মেইনটেন্যান্স অরগানাইজেশন বা ছোট ছোট সাব-কন্ট্রাক্ট প্রতিষ্ঠান।
পাঁচ.
অন্যান্য খাত যা স্বাস্থ্যের সঙ্গে সংযুক্ত: স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকে যেসব খাত তাদের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে এ খাতে অবদান রেখে থাকে। যেমন কৃষি, শিক্ষা, যোগাযোগ, পানিসম্পদ ইত্যাদি।
ছয়.
প্রযুক্তি খাত: ব্যক্তিগতভাবে আমি এই খাতকে পাঁচ নম্বর ক্যাটাগরিতে না ফেলে একেবারে আলাদা একটি দলভুক্ত করতে চাই। তার কারণ, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে প্রযুক্তি একাই স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
সাত.
জনগোষ্ঠী: সাধারণ জনগণ শুধু স্বাস্থ্য খাতের ক্রেতা বা ভোক্তাই না, তারা একক বা সামষ্টিকভাবে নানা রকমের সংগঠনের মাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। কেউ যেমন এককভাবে রোগ প্রতিরোধমূলক জীবনযাপন করতে পারেন, তেমনি গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে কমিউনিটি হেলথ কাউন্সিল বা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ তৈরি করে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্বাস্থ্যের মতো জটিল এবং ব্যয়বহুল একটি খাতের সংস্কারকে খুব স্বল্প পরিসরে ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব। তবু পৃথিবী জুড়ে যে ধরনের স্বাস্থ্য খাত বা ব্যবস্থা বিদ্যমান, বাংলাদেশের মতো সমমানের আয়ের দেশের উদাহরণ এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এই সংস্কারের একটি রূপরেখা তৈরি করতে পারলে হয়তো ভবিষ্যতের জন্য তা কিছুটা দিকনির্দেশনা দিতে পারে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা গ্লোবাল হেলথ সিস্টেমকে মোটামুটি চার-পাঁচ রকমের ভাগে ভাগ করা যায়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে যে ব্যবস্থা চালু আছে, তাকে বলা হয় বেভেরিজ মডেল; এই ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যব্যয় নির্বাহ হয়ে থাকে জনগণের কর থেকে। জার্মানি, ফ্রান্স, জাপানসহ বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশ এমনকি দক্ষিণ আমেরিকায় দেখতে পাওয়া যায় যে মডেল, তাকে বলা হয় বিসমার্ক মডেল। এই মডেলে বিমা কোম্পানিগুলো সবার স্বাস্থ্যব্যয় নির্বাহ করলেও এরা কোনো লাভ করতে পারে না। অন্যদিকে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা মডেল এই দুই মডেলের সমন্বয়ে তৈরি। এখানে বেসরকারি খাত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে আর সরকারি বিমা সংস্থা তার খরচ বহন করে। এতে জনগণের অর্থিক অবদান থাকে। এই মডেলের বড় উদাহরণ কানাডা। নতুন শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়াও এ মডেলের মধ্যে পড়ে। মার্কিন মডেলটিকে একটি একক মডেল হিসেবে ধরা যায়। বর্তমান মার্কিন সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে এ মডেলের সংস্কার করতে। কারণ, পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের চেয়ে চার গুণ ব্যয় করেও এই মডেল জনগণের স্বাস্থ্য-সূচকে অনেক পিছিয়ে আছে। শিল্পোন্নত এবং কিছু উচ্চ ও মধ্য আয়ের দেশ ছাড়া, পৃথিবীর বাকি দেশগুলোর সত্যিকার অর্থে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নেই। এদের ‘আউট অব পকেট’ মডেল বলা হয়। এখানে সরকার, বেসরকারি খাত, এনজিও এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলে একটি জগাখিচুড়ি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ভারত, এমনকি চীন বা আফ্রিকার দেশগুলো এই দলভুক্ত, আর বাংলাদেশও এই স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার মধ্যে মধ্যেই পড়বে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যেতে পারে তা আগেভাগে আমলে নেওয়া শ্রেয়তর। সবচেয়ে বেশি যা জরুরি তা হলো, সরকারি অঙ্গীকার, দায়বদ্ধতা, সৎ প্রশাসনিক শাসনপদ্ধতি এবং নেতৃত্ব। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের নানান উদ্যোগ দেখা গেছে। কিন্তু সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রহীনতার কারণে দীর্ঘ সময় সরকারি অঙ্গীকার এবং নেতৃত্ব লক্ষ করা যায়নি। বর্তমানের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা।
গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে অনেক বেশি আশা করে সাধারণ মানুষ। ১৯৯০ সালে স্বাস্থ্যনীতি প্রণীত হয়, কিন্তু তা পুরোপুরি কখনোই কার্যকর করা হয়নি। ১৯৯৮-২০০৩ সালে সাব-ডিস্ট্রিক্ট বা মহকুমা পর্যায়ে স্বাস্থ্য এবং পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রম, জনবল প্রশিক্ষণ একত্রীকরণ করা হয়। সেই সঙ্গে ১৯৯৮-২০০০ সালে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য ক্লিনিক স্থাপন করা হলেও পরবর্তীকালে আর পরিকল্পিত কোনো সংস্কার লক্ষ করা যায় না। বর্তমান সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে, স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ বৃদ্ধির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যদি পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করে, তবে এই সংস্কার সেই আগের মতোই বিছিন্ন পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে। ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬০ হাজারের বেশি চিকিৎসক, এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি নার্সের ঘাটতি রয়েছে। কিচিৎসক-নার্স অনুপাত এবং রোগী আর হাসপাতাল শয্যার অনুপাত এখনো অনেক নিম্ন আয়ের দেশের চেয়ে কম। সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা মাত্র ২৫ শতাংশ লোক ব্যবহার করে থাকে। স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা এতটাই অপ্রতুল যে একে নাই বললেই চলে। স্বাস্থ্য-প্রযুক্তির ঘাটতি, এলাইড হেলথ প্রফেশনাল যেমন ফিজিওথেরাপিস্ট, ল্যাবরেটরি সহকারী, এক্স-রে টেকনশিয়ানের ঘাটতি একেবারে বিপজ্জনক পর্যায়ে আছে। অন্য দিকে বেসরকারি এবং সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ভালোমন্দ বিচার করতে হয় সামষ্টিক এবং ব্যষ্টিক অর্থনীতির অনুষঙ্গে। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার সবার সমান কি না, কী ধরনের সেবা বিদ্যমান, কীভাবে সেই সেবার খরচ বহন করা হয়, কী ধরনের মান-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে, কারা তা নিয়ন্ত্রণ করেন ইত্যাদি বিষয়ে ‘টেকনিক্যাল এবং অ্যালোকেটিভ এফিশিয়েন্সি’ পর্যালোচনা করা জরুরি। পৃথিবীর নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশে যে ধরনের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার হয়েছিল, তার ফলাফলের দিকে নজর দেওয়া যায়। ১৯৯১-৯২ সালে জাম্বিয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাইরে সেন্ট্রাল বোর্ড তৈরি করা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাত পরিচালনার জন্য; আশির দশকে চিলিতে প্রাইভেট ইনস্যুরেন্স এবং নব্বইয়ের দশকে কলাম্বিয়ায় সোশ্যাল ইনস্যুরেন্স নামের একটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। আমার গ্লোবাল হেলথের গবেষণার সুবাদে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সংস্কারপদ্ধতি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে (যেমন ঘানা)। এই দেশগুলোতে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্স স্কিম চালু করা হয়েছে যাতে ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার দেওয়া যায়। এসব সংস্কারের চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে, বাংলাদেশের সম্পদের বা রিসোর্সের খতিয়ান নিয়ে, আগের সব স্বাস্থ্যনীতি এবং স্বাস্থ্য সংস্কারকে আমলে নিয়ে একটি নতুন স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর জন্য সরকারি উদ্যোগে সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পনা দল তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে যেমন থাকবেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, তেমনি দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য খাতের নানাভাবে জড়িত প্রতিনিধিরা। যাঁদের মাধ্যমে গবেষণা এবং প্রমাণসিদ্ধভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বা স্ট্রাটেজিক প্ল্যান তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে সরকারি এবং বিরোধী দলের স্বীকৃতি থাকবে, যাতে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও স্বাস্থ্য খাতের কৌশলগত কর্মকাণ্ডের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ এখন মধ্য-বয়সে পরিণত দেশ, অমিত সম্ভাবনাও আছে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটে যাওয়া এই যুগে। সেই সম্ভাবনা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। কিন্তু একটি দেশ কখনোই অর্থনীতিতে চাঙা হতে পারে না, একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া। আর একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীর পূর্বশর্ত একটি পরিকল্পিত স্বাস্থ্যনীতি, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার। বাংলাদেশে এখনো ৭২ শতংশ মানুষ গ্রামে বাস করে, এখনো প্রতি ১০০০ জন শিশুর মধ্যে ৪৮ জন মারা যায় পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় জাতীয় আয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৪ ভাগ। যোগাযোগ-ব্যবস্থার অপ্রতুলতার জন্য গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতির যে অন্তরায় ছিল, নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন দিয়ে তা এখন অতিক্রম করা খুবই সহজ। টেলিমেডিসিন, ভার্চুয়াল ক্লিনিক প্রভৃতি নানা রকমের উদ্ভাবন দিয়ে এসব বাধা দূর করে স্বল্প-ব্যয়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব।
কিন্তু সব কিছুর মূলে দরকার একটি পরিকল্পিত স্বাস্থ্যনীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার। আবারও আগের কথায় ফিরে আসি; বিচ্ছিন্ন পরিবর্তন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ধনাত্মক ফলাফল আনতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতে স্থায়ী-টেকসই, উদ্দেশ্যমূলক-পরিকল্পিত এবং মৌলিক পরিবর্তন, যাকে অন্যভাবে বলা হয় ‘হেলথ সেক্টর রিফর্ম’, তা দিয়েই এই অর্জন সম্ভব। আমার বিশ্লেষণে এই সংস্কার সুদূরপরাহত নয়, একটি অর্জনক্ষম স্বপ্ন। যে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ!
সেজান মাহমুদ
পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি লেখক, গীতিকার ও কলামিস্ট হিসেবেও খ্যাতিমান। বর্তমানে ফ্লোরিডা এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের জনস্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন শাখার এপিএইচ-পিএইচইএইচপি আরলি ক্যারিয়ার পুরস্কার পেয়েছেন সেজান মাহমুদ। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএইচ এবং বার্মিংহাম থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। লেখক হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তিনি প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
সূত্র - প্রথম আলো

