স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রশিক্ষণে অতি উৎসাহ
02 November,13
Viewed#: 51
প্রশিক্ষণ পেতে পারেন এমন জনবলের চেয়ে ১২ গুণ বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই হিসাব গত অর্থবছরের। এ জন্য তারা দৈনিক গড়ে এক কোটি টাকা বেশি খরচ করেছে। মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে (২০১৩) এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। অংশগ্রহণকারী বাছাই, প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনা, সম্মানী দেওয়া নিয়ে অনিয়ম হয়। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্ত ও নিরীক্ষায় দুর্নীতি-অনিয়ম ধরা পড়েছে। তার পরও প্রতিবছর প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার পরিমাণ এবং তাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব প্রশিক্ষণ আদৌ হয় কি না, তা নিয়ে আমার নিজেরই সন্দেহ আছে। এ ব্যাপারে নজরদারি ও মূল্যায়নের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
৩২টি কার্য পরিকল্পনার (অপারেশনাল প্ল্যান) মাধ্যমে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচপিএনএসডিপি) বাস্তবায়ন করছে মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর। প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা হয়েছে এসব কর্মপরিকল্পনার অধীনে। ১১ জন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এইচপিএনএসডিপি মূলায়ন করেছে। প্রশিক্ষণ সম্পর্কে এই বিশেষজ্ঞ দল মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কমিটি তৈরির সুপারিশ করেছে। এই কমিটির প্রশিক্ষণনীতি চূড়ান্ত করাসহ প্রশিক্ষণ সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন করবে ।
১২ গুণ বেশি অংশগ্রহণকারী: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মো. সিফায়েতউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আওতায় পড়েন না। মূলত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই এ সুযোগ পান।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরে প্রশিক্ষণ পেতে পারেন এমন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা এক লাখ ১০ হাজার। আর গত অর্থবছরে ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৯৩ জন প্রশিক্ষণ (৫৫ শতাংশ) ও কর্মশালায় (৪৫ শতাংশ) অংশ নেন। এই সংখ্যা মন্ত্রণালয়ের জনবলের ১২ গুণের বেশি।
দুটো কারণে সংখ্যাটা এত বড় হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যসচিব। প্রথমত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন, এমন অনেকেই প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একাধিকবার প্রশিক্ষণ দেওয়ার সংখ্যাটা এমন হয়েছে।
দিনে কোটি টাকা খরচ: সরকারি হিসাব বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই খাতে ২৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ খাতে ১৮৬ কোটি এবং কর্মশালা ও সেমিনারে খাতে ৭২ কোটি টাকা খরচ করা হয়।
সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি বাদ দিলে গত অর্থবছরে কর্মদিবস ছিল ২৪০ দিনের মতো। সেই হিসাবে প্রতি কর্মদিবসে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে এ খাতে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এবং সরকারি তদন্তে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণে নানা অনিয়ম হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক বলেছেন, প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনাকাটা এবং সম্মানী দেওয়ার ক্ষেত্রেই মূলত অনিয়ম হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যাগের জন্য ৫০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও দেওয়া হয় কম দামের ব্যাগ বা কম দামি ফোল্ডার। অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারীদের সম্মানী ৬০০ টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু নানা অজুহাতে তা কমিয়ে দেওয়া হয়।
বাস্তব পরিস্থিতি: জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি (এনএনএস) নামের কার্য পরিকল্পনা থেকে বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিন দিনের পুষ্টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছিল আধা বেলায়। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাগ, খাতা/প্যাড ও সম্মানী দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে প্রথম আলোয় গত বছর ২ অক্টোবর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়। এরপর মন্ত্রণালয় এ নিয়ে তদন্ত করে এবং অনিয়ম পায়।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের ফাপাদের (ফরেন এইড প্রজেস্টস অডিট ডাইরেক্টরেট) নিরীক্ষায়ও এনএনএসে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনিয়ম ধরা পড়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণের জন্য কোনো অফিস আদেশ ছিল না। প্রশিক্ষণদাতা ও গ্রহীতার নামের তালিকাও নিরীক্ষক দল পায়নি। প্রশিক্ষণসূচি, প্রশিক্ষণ সহায়িকা, অফিস আদেশ, প্রশিক্ষণার্থীদের হাজিরার হিসাব ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয়। এসব প্রশিক্ষণের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ফাপাদ।
প্রথম আলোর হাতে আসা অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (এনসিডিসি) কর্মপরিকল্পনার কাগজপত্রে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১০ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত আঘাত প্রতিরোধবিষয়ক কর্মশালায় যোগ দিতে একজন কর্মকর্তা কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত ছিলেন। আবার ১০ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত একই ধরনের কর্মশালায় যোগ দিতে ওই কর্মকর্তা ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও উপস্থিত ছিলেন। দুই জায়গা থেকেই তিনি টাকা নিয়েছেন। এ রকম নজির আরও আছে।
এসব অনিয়মের কথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানেন। তার পরও প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ওপর নজরদারি নেই। প্রতিবছর প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা বাড়ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন দুই লাখ ৭৬ হাজার জন। এ বছর ১৩ লাখ ৭৪ হাজার। এক বছরে ১১ লাখ বেশি। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত আছে।
সূত্র - প্রথম আলো