শিশুমৃত্যু রোধে সরকারের কর্মসূচিতে কম ওজনের শিশু বা সময় হওয়ার আগেই জন্ম নেওয়া বা অপরিণত শিশুদের ক্যাঙারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) সেবা চালু করার কথা বলা হয়েছে। সময়ের আগে জন্মানো শিশুর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গই অপরিণত থাকে। একটি অপরিণত শিশুর শরীরের তাপমাত্রা খুব কম থাকে। শরীরে যে পরিমাণ তাপমাত্রা থাকা দরকার, তা তাদের থাকে না। ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতিতে ক্যাঙারু তার সন্তানকে যেভাবে বুকে আগলে রাখে, সেভাবে মাকে তাঁর বুকে সন্তানকে চেপে ধরতে বলা হয় শিশুর শরীরের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য।
যেসব শিশু ২৮ সপ্তাহের কম সময়ে জন্মগ্রহণ করে এবং যাদের ওজন দুই কেজির কম, তাদের চিকিৎসা ও সেবা প্রদানের জন্য এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাপদ্ধতি। এই পদ্ধতি ইনকিউবেটর (তাপ দেওয়ার যন্ত্র) পদ্ধতির মতোই কার্যকর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
১৯৭৮ সালের কথা। কলম্বিয়ার অপরিণত শিশুরা ভীষণ ভুগছে। সুস্থতা আর বেঁচে থাকার জন্য এই শিশুদের দরকার উষ্ণতা। কৃত্রিম উপায়ে উষ্ণতা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, তবে সংকট ব্যাপক। কলম্বিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিওন্যাটালজি বিভাগের অধ্যাপক এডগার রে স্যানাব্রিয়া বিকল্প খুঁজতে লাগলেন। তাঁর মাথা থেকেই বেরোল ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতির। দুই দশকের গবেষণায় বেরিয়ে এল স্বল্প ওজনের অপরিণত শিশুদের সুস্থতার জন্য ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি খুবই কার্যকর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউকিউবেটরের চেয়েও ভালো কাজ করে থাকে। ডব্লিউএইচও আরও বলছে, মায়ের বুকের উষ্ণতা পাওয়া অপরিণত শিশুদের হূদ্যন্ত্র, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, অক্সিজেন গ্রহণের হার, ঘুমের পরিমাণ ও ধরন কৃত্রিমভাবে উষ্ণতা পাওয়া শিশুদের মতো বা তার চেয়েও ভালো। ডব্লিউএইচও মনে করে, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশে যেখানে ইনকিউবেটরের সহজপ্রাপ্যতা নেই, সেসব দেশে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার খুব উপযোগী পদ্ধতি।
বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা স্বল্প পরিসরে চালু আছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) মতলব হাসপাতালে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি চালু আছে। এই হাসপাতালের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ল্যাম্ব হসপিটালেও এ পদ্ধতি চালু হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এখনো হাসপাতালগুলোতে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি চালু হয়নি।
আইসিডিডিআরবি মতলব হাসপাতালের ক্যাঙারু মাদার কেয়ার ইউনিট (কেএমসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের জুলাই মাসে এ হাসপাতালে এই চিকিৎসাপদ্ধতি চালু হয়। গত ছয় বছরে মা ও শিশু স্বাস্থ্য (এমসিএইচ) কর্মসূচির আওতায় এ পদ্ধতিতে উপজেলার ৬৭টি গ্রামের ৭২৪টি অপরিণত শিশুকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়। চলতি বছর সুস্থ করা হয় ৬৮টি নবজাতককে। এ ছাড়া ২৮ সপ্তাহের কম সময়ে জন্ম নেওয়া ১০টি অপরিণত নবজাতককে এখানে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানো হয়। (এসব নবজাতক সাধারণত বাঁচে না)
হাসপাতালের ক্যাঙারু মাতৃসেবা বিভাগের (ইউনিট) দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসা কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা জানান, এ পদ্ধতিতে ক্যাঙারু যেভাবে পেটের থলিতে বাচ্চাকে রাখে, সেভাবে নবজাতককে মায়ের বুকে রাখা হয়। অপরিণত ও স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের নবজাতকের শরীরে এমনিতেই তাপমাত্রা কম থাকে। এতে এদের মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে অনেক বেশি। এ পদ্ধতিতে মায়ের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নবজাতকের শরীরে প্রবাহিত হয়। এতে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি কমে। এতে মায়ের বুকের দুধপান নিশ্চিতকরণ সহজ হয় এবং সন্তানের সঙ্গে মায়ের বন্ধন দৃঢ় হয়।
উপজেলার দিঘলদী গ্রামের বাসিন্দা সেলিনা আক্তার (৩০) জানান, তাঁর অপুষ্ট শিশু এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। জন্মের সময় ওর ওজন এত কম ছিল যে, তার বাঁচারই কথা নয়। এই পদ্ধতির চিকিৎসা আরামদায়ক ও সহজতর।
আইসিডিডিআরবি মতলব হাসপাতালের প্রধান মো. আল ফজল খান বলেন, ‘এটি একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে যেকোনো হাসপাতালে, এমনকি বাড়িতেও চিকিৎসা সম্ভব। দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে অপরিণত সদ্যোজাত শিশু এ পদ্ধতির চিকিৎসায় মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়ে সুস্থ হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বড় বড় হাসপাতালে যেখানে ইনকিউবেটরের সুবিধা নেই, সেখানে এ পদ্ধতি চালু করা উচিত।’
সূত্র - প্রথম আলো

