চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক এগোলেও এ দেশের চিকিৎসকেরা নৈতিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকেরা নৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থেকে পেশাচর্চা করলে চিকিৎসা ব্যয় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
গতকাল শনিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আয়োজিত চিকিৎসকদের নৈতিকতাবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকেরা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা পরিষদ (বিএমডিসি) ও বিএসএমএমইউ যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে।
চিকিৎসকদের রোগীর কাছে ভুল পরিচয় উপস্থাপন, ব্যবস্থাপত্রে প্রয়োজনের বেশি ওষুধ লেখা, ভুল ওষুধ লেখা, রোগনির্ণয় কেন্দ্র থেকে অর্থ নেওয়া, সরকারি চিকিৎসকদের ক্লিনিকে পেশাচর্চা, অর্থের বিনিময়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানোর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। নিজেদের সমালোচনা করে চিকিৎসকেরা বলেন, তাঁদের সম্মান ও মর্যাদার পতিত অবস্থার জন্য মূলত চিকিৎসকেরাই দায়ী।
মূল উপস্থাপনায় বিএসএমএমইউর সহ-উপাচার্য মো. সহিদুল্লা বলেন, পেশাচর্চার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে রোগীর স্বার্থ সবকিছুর ওপরে। চিকিৎসকদের নৈতিকতার বিষয়টি বহু পুরোনো ও আলোচিত বিষয়। সেবা নেওয়ার পর রোগীর উপকার না হোক, ক্ষতি যেন না হয়, এটা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে সঠিক তথ্য জানানো, সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে রোগীর স্বাধীন মতামত, রোগীর তথ্য গোপন রাখা, সর্বোপরি রোগীকে মর্যাদা দেওয়া চিকিৎসকের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএমডিসির সভাপতি আবু শফি আহমেদ আমিন জানান, চিকিৎসকদের পেশাচর্চার নৈতিকতা বিষয়ে সচেতন করার জন্য দুই বছর মেয়াদে প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিএমডিসি। পাঠ্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক ও হাসপাতালের মালিক, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের সঙ্গে পৃথক পৃথক সভা করা হবে। দুই বছর শেষে চিকিৎসকদের করণীয় বিষয়ে একটি নির্দেশিকা তৈরি হবে।
বিএসএমএমইউর উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত চিকিৎসকদের পতিত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘একসময় চিকিৎসককে রোগীরা বলত, “ওপরে আল্লাহ আর নিচে আপনি”। এখন আর তা বলে না। চিকিৎসকেরা নিজেরাই সেই মর্যাদার আসন থেকে নিজেদের সরিয়ে ফেলেছেন।’
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান বলেন, কী রোগ পাওয়া গেল, সেই রোগের চিকিৎসা কী এবং রোগীর ভবিষ্যৎ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর রোগীকে জানানো চিকিৎসকের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও এ দেশের চিকিৎসকদের মানের কোনো তারতম্য নেই। তবে সেখানকার চিকিৎসকেরা রোগীকে বেশি সময় দেন, আন্তরিকভাবে কথা বলেন। এতে রোগীর আস্থা বাড়ে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশে সরকারি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত পেশাচর্চার (প্রাইভেট প্র্যাকটিস) নজির নেই। সরকারি চিকিৎসকেরা শিক্ষকতাও করেন, বিকেলে ব্যক্তিগতভাবে রোগীও দেখেন।
প্রকল্প পরিচালক জি এইচ রব্বানি জানান, চিকিৎসকদের পেশাচর্চার বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রকল্পের অধীন একটি গবেষণার কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআরবি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা অংশ নেন।
সূত্র - প্রথম আলো

