মাদক হিসেবে কিছুদিন আগে পর্যন্তও অভিভাবক থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্বেগের প্রধান কারণ ছিল ফেনসিডিল। এখন ইয়াবার ভয়ংকর ব্যাপকতা হার মানিয়েছে ফেনসিডিলসহ অন্য সব মাদককে।ছয় বছর আগেও যে ইয়াবা অভিজাত নেশা হিসেবে পরিচিত ছিল, তা এখন রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে আসা এই বিধ্বংসী মাদক প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সারা দেশে ইয়াবার খুচরা বিক্রেতা বা বাহক পর্যায়ে অহরহ অনেকে ধরা পড়লেও সীমান্ত গলিয়ে আসা ‘মূল স্রোত’ বন্ধের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।পুলিশ, র্যাব ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে ইয়াবা তৈরি হয় না। তবে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে চোরাই পথে এ দেশের বাজারে ঢুকছে ইয়াবা। আর এ কাজে কক্সবাজার এলাকার সরকারদলীয় একজন সাংসদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলেও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
সহজ পাচার: জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) থেকে প্রকাশিত বিশ্ব মাদক প্রতিবেদনে ২০১৩ সালে ইয়াবা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে এক লাখ ৩০ হাজার, ২০১০ সালে আট লাখ ১২ হাজার এবং ২০১১ সালে ১৪ লাখ ইয়াবা বড়ি ধরা পড়ে। অবশ্য মিয়ানমারের আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ইয়াবা উদ্ধারের সংখ্যা সবচেয়ে কম বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা বলছেন, যত পরিমাণ ইয়াবা ধরা পড়ে, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি পরিমাণে দেশে ব্যবহার হচ্ছে।
একাধিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফের অরক্ষিত সীমান্ত ও বিস্তীর্ণ উপকূল দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসছে। টেকনাফ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের গ্রামগুলোতে শুধু বাংলাদেশে সরবরাহের জন্য গড়ে উঠেছে ইয়াবা তৈরির অনেকগুলো গোপন কারখানা। আকারে ছোট হওয়ায় ইয়াবা বহন সুবিধাজনক। দেশলাইয়ের বাক্স বা মুঠোফোনের ব্যাটারির জায়গায়ও ইয়াবা বহন সম্ভব। তাই ইয়াবা দেশে ঢোকার পর তা ছড়িয়ে পড়াটা রোধ করা খুবই কঠিন। এ জন্য সীমান্তেই ইয়াবার প্রবেশ রোধ করা জরুরি বলে মনে করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
মাদকসংক্রান্ত সরকারের তিনটি সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সীমান্ত দিয়ে ঢোকার পর দেশের ভেতরে ইয়াবা বাজারজাত করার জন্য ৭০ থেকে ৮০ জন মাদক চোরাচালানি রয়েছে। এসব ব্যক্তি মাদক চক্রের কাছে ‘ডিলার’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন সংস্থার করা ইয়াবা ডিলারদের তালিকায় কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকার সরকারদলীয় সাংসদ আবদুর রহমানের (বদি) চার ভাইয়ের নাম রয়েছে।
অবশ্য সাংসদ আবদুর রহমানের বিরুদ্ধেও ইয়াবা চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি গত জুনে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ার পর সুবিধা পেতে আমার নাম বলে থাকে। আমার ভাইয়েরা কর দিয়ে বৈধভাবে টেকনাফ বন্দরে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করে। আর আমি থাকি ঢাকায়।’
সরকারদলীয় এই সাংসদ আরও বলেন, টেকনাফের প্রায় ৪৫ কিলোমিটার সীমান্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এর কারণে ইয়াবা সহজে পাচার হয়ে আসছে। তিনি সংসদে দাঁড়িয়েও এই সীমান্ত সুরক্ষিত করার কথা বলেছেন বলে দাবি করেন।
গ্রাসের শিকার শিক্ষার্থীরা: অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়মিত ইয়াবা সেবন মেদ নিয়ন্ত্রণ করে, যৌনশক্তি বাড়ায়, ক্লান্তি দূর করে—শুরুর দিকে এমন কিছু ভুল তথ্য ছড়িয়ে ঢাকার অভিজাত পাড়ায় ইয়াবা বাজারজাত করা হয়। পরে তা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ বিভিন্ন বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইয়াবার বাজারজাত বাড়ানো হয়। যা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সঙ্গদোষে এমনকি মেয়েরাও এই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
আসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের (আপন) চিকিৎসা ব্যবস্থাপক হাসিবুর রহমান বলেন, তাঁদের মানিকগঞ্জের আপনগাঁও কেন্দ্রে দেড় শ রোগীর মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি ইয়াবা আসক্ত। আবার ইয়াবা আসক্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৩০-এর মধ্যে। স্কুলপড়ুয়াও আছে কিছু। তিনি বলেন, নারী আসক্তদের প্রায় সবাই ইয়াবার শিকার, তাঁদের বেশির ভাগ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।মাদকের অর্থ জোগাড় করতে অনেকে অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক কালে যেসব অপরাধী ধরা পড়ছে, তাদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, মুঠোফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট, চ্যাটরুমগুলোর মাধ্যমে যোগাযোগ করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে তরুণদের হাতে। ছোট্ট একটা ট্যাবলেট হাত বদল হলেই বিক্রেতার ১০০ টাকা লাভ। অনেক সময় বন্ধুমহলে ইয়াবার জোগান দিতে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-তরুণেরা নিজেরাই ইয়াবাসেবী থেকে বিক্রেতা বনে যাচ্ছে।
স্কুলে মাদক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হলেও উদ্যোগ নেই: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত মার্চ মাসে জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড স্কুলগুলোতে মাদকাসক্তি পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নয়জন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী, দুজন সচিবসহ ১৯ সদস্যের এই বোর্ড আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেই সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্কুলে বিশেষ করে রাজধানীর ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ইয়াবার ভয়াবহ প্রকোপ ঠেকাতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বোর্ড। এ ধরনের উদ্যোগ একদিকে যেমন মাদকাসক্ত শিশুদের শনাক্ত করবে, অন্যদিকে শিশুদের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করবে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না মেলায় তাঁরা সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারছেন না।
সূত্র - প্রথম আলো

