শেষ পর্যন্ত হারিয়েই গেল সালফার মিশ্রিত ১৭৭ টন সরকারি গম। ২৬ বছরেও হদিস মেলেনি। উদ্ধারও হয়নি। শাস্তি পাননি সংশ্লিষ্টরাও। ১৯৮৭ সালে খুলনার কয়েকটি গুদাম থেকে হারিয়ে যায় ওই গম। এ নিয়ে মামলা হয়। রায় হয় ২০০২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি। এতে খুলনার বিভাগীয় স্পেশাল জজ মো. মজনুল আহসান সালফার মিশ্রিত গম কোথায় তা জানতে চান। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১১ বছর। হদিস মেলেনি ওই গমের। রায়ে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার দায়ে প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হয় খুলনার তৎকালীন সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক জামাল উদ্দিন শিকদারসহ আরও কয়েক জনকে। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি খাদ্য মন্ত্রণালয়। উল্টো নিরপরাধ হিসেবে মামলা থেকে বেকসুর অব্যাহতি পাওয়া কর্মকর্তা (উপ-খাদ্য পরিদর্শক) ইমারত হোসেন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। পরে চাকরি ফিরে পেলেও পাননি সরকারি সুযোগ-সুবিধা। এমনকি বেতনের টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়নি তাকে। বয়স শেষ হওয়ায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। তবে এখনও তিনি ঘুরছেন বেতন-ভাতা আদায়ের পেছনে। লিখছেন একের পর এক দরখাস্ত। ধরনা দিচ্ছেন অফিসের এক শাখা থেকে আরেক শাখায়। রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮৭ সালে বিদেশ থেকে এমভি মিহন জাহাজে করে ৬৩০ দশমিক ২৬৫ মেট্রিক টন গম আমদানি করে সরকার। পরে ওই জাহাজ থেকে গম খালাস করে এমভি তাহসিন নামের জাহাজে করে নেয়া হয় খুলনার মংলা বন্দরে। ওই জাহাজের ১ নং হ্যাচের গম খালাস করে বার্জ অন্নতরী, রূপসী ও ন্যাশনাল এর মাধ্যমে পরিবাহিত করে মহেশ্বর পাশা ঘাট এর মাধ্যমে চারটি খামালে মজুত করা হয়। এসব গমের মধ্যে মিশ্রিত ছিল খনিজ পদার্থ সালফার। বিষয়টি যাচাই করতে গমের স্যাম্পল পাঠানো হয় ঢাকায় বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য গবেষণাগারে। সেখান থেকে সালফারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। তারা স্যাম্পল পরীক্ষা করে দেখে গমের সঙ্গে সালফারের পরিমাণ শূন্য দশমিক ০৩২ ভাগ। এরপরই গম ও সালফার আলাদা করতে চার সদস্যর একটি ঝাড়াই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন শিকদারকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়। এতে সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন তৎকালীন গোডাউন ম্যানেজার রফিকুল আলম। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঝাড়াই-বাছাই করতে গিয়ে ১৭৭ টন সালফার মিশ্রিত গম সরিয়ে ফেলা হয়। পরে হিসাবে তা ঘাটতি দেখানো হয়। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জামাল উদ্দিন শিকদার ও সদস্য সচিব তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। এদিকে গম ঘাটতির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে এ নিয়ে মামলা করা হয়। এতে আসামি করা হয় উপ-খাদ্য পরিদর্শক ইমারত হোসেনকে। শেষ পর্যন্ত আদালত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে তাকে বেকসুর খালাস দেন। এ প্রসঙ্গে ইমারত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, সালফার মিশ্রিত ওই গম বিক্রি করে জামাল উদ্দিন শিকদার এখন কোটিপতি বনে গেছেন। চাকরি থেকে অবসরে গেলেও তিনি খাদ্য ভবনে অফিস দখল করে থাকেন দীর্ঘদিন। বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হলেও তাকে ওই অফিস থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। তিনি এখনও খাদ্য ভবনের কর্মকর্তা বলে মানুষের কাছে পরিচয় দেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নানা নিয়োগ নিয়ে লবিং করাই এখন তার প্রধান কাজ। এ বিষয়ে জামাল উদ্দিন শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক পুরনো। এ নিয়ে কথা বলতে চায় না। এরপরই তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহম্মদ হোসেন খান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আামি তেমন কিছু জানি না। শুনেছি এ নিয়ে আদালতে একটি মামলা হয়েছিল। জামাল উদ্দিন শিকদার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও তিনি দীর্ঘদিন অবৈধভাবে অফিস দখল করে বসেছিলেন। বিষয়টি জানার পর আমি অফিসিয়ালি তাকে চিঠি দিয়ে কয়েক দিন আগে অফিস থেকে সরিয়ে দিয়েছি।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

