দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের একটি অংশ নির্ধারিত মেয়াদে ভিটামিন ‘এ’ খেতে পারছে না। এসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ সুরক্ষার বাইরে আছে এক বছরের বেশি সময়। ছয় মাস পর পর তা খাওয়ানোর কথা থাকলেও অপপ্রচার ও আতঙ্কের কারণে কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে ভিটামিন ‘এ’ না খাওয়ানোর ফলে পুষ্টি সমস্যা দূর হবে না। অথচ সেই অপপ্রচার ও আতঙ্কের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও প্রকাশ করছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে শিশুরা আরও বেশি করে ভিটামিন ‘এ’ সুরক্ষার বাইরে থাকতে পারে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে অভিভাবকদের শঙ্কা দূর হতো।
ভিটামিন ‘এ’ অপুষ্টিজনিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা থেকে শিশুদের রক্ষা করে। এর অভাবে শিশুরা রাতকানা রোগের শিকার হয়। স্বাধীনতার পর দেশে ৬ শতাংশ শিশুর মধ্যে এই রোগ দেখা যেত। বর্তমানে তা কমে দশমিক শূন্য ৪ (.০৪) শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশব্যাপী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচির কারণে এই হার কমেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। শিশুর রক্তে ভিটামিন ‘এ’ প্রায় তিন থেকে চার মাস থাকে। সঞ্চিত ভিটামিন থেকেই শিশু তার চাহিদা পূরণ করে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে ছয় মাস পর পর এ দেশের শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এর সঙ্গে কৃমিনাশক খাওয়ানো শুরু হলে এই কর্মসূচির নাম হয় ‘ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’।
বাদ পড়া শিশুরা: ২০১২ সালের ২ জুন দেশব্যাপী ‘ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’ কর্মসূচি পালিত হয়। ছয় মাস পর এ বছর ৫ জানুয়ারি পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়। তখন ক্যাপসুলের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। ভারত ও সিঙ্গাপুরে দুই দফা মান পরীক্ষা করার পর ১২ মার্চ শিশুদের তা খাওয়ানোর দিন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সে সময় অপপ্রচার এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কারণে বহু অভিভাবক শিশুকে নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাননি। শিশুমৃত্যুর গুজব ছড়ায়। গভীর রাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে আতঙ্কিত অভিভাবকেরা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করেন।
সাধারণত স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে বাদ পড়া শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ান। এবারও তা করার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ মার্চ স্বাস্থ্যসচিবের নির্দেশে স্বাস্থ্যকর্মীরা সেই কাজ বন্ধ করে দেন।
জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কমিটি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে স্বাস্থ্যসচিবের কাছে প্রতিবেদনও জমা দেয়। এই প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাননি বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু যাঁরা জানতে চেয়েছেন, তাঁদের জানানো হয়েছে।
এর আগে ২০০৯ সালে একই ধরনের ঘটনা তদন্তে কমিটি হয়েছিল। কমিটি তখন ১২ দফা সুপারিশ করেছিল। তবে কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়।
এদিকে ১৮ জুলাই জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর পরবর্তী দিন নির্ধারণ বিষয়ে সভা হয়। সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদন তাঁরা পাননি বলে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়নি।
দায়সারা তদন্ত: ১২ মার্চের ঘটনার তদন্ত কমিটির মূল কাজ ছিল অপপ্রচার ও গুজবের উৎস ও কারণ খুঁজে বের করা। কিন্তু তদন্ত কমিটি ঢাকা শহরের বাইরে যায়নি। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কারণও চিহ্নিত করতে পারেনি। কমিটি বলেছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। ক্যাপসুল ও বড়ির মান ঠিক ছিল।
১৩ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে অপপ্রচারের অভিযোগে কক্সবাজার এলাকার এক ইমামকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর ওই বক্তব্য পরদিন সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। তদন্ত দল সিফায়েত উল্লাহর বক্তব্য নেয়নি বা ওই ঘটনার কোনো উল্লেখও প্রতিবেদনে নেই।
তদন্ত কাজে লাগে না: এর আগে ২০০৯ সালের ৬ জুন ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের সময় শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছিল। তখনো সরকার পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। শিশুমৃত্যু সম্পর্কে গণমাধ্যমে খবর ছিল ভিত্তিহীন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কর্মসূচির আগে ও পরে প্রশাসন, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার কর্মী, সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় ও যোগাযোগ করার কথা বলা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র - প্রথম আলো

