খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘খাদ্য নিরাপত্তা আইন-২০১৩’ এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। খবরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘পিওর ফুড অর্ডিনেন্স’ নামে ১৯৫৯ সালের যে আইনটি ছিল, তা রহিত ও যুগোপযোগী করে এই আইন করা হচ্ছে। খবরে এ-ও জানা গেছে, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের একটি উপদেষ্টা কমিটি থাকবে, যার সভাপতি হবেন খাদ্যমন্ত্রী। এই আইনে অপরাধীরা ফৌজদারি দ-বিধির অধীনে বিচারযোগ্য হবে। এই লক্ষ্যে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই আইনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুসারে বিচারকাজ পরিচালনা করা হবে। জনস্বাস্থ্যরক্ষায় খাদ্যে ভেজালের ব্যাপারে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। গত সোমবার মন্ত্রিসভায় এই আইনের খসড়ায় নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দেশে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণের বর্তমান চরম বাস্তবতায় সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনসহ বিধি-বিধান প্রণয়ন ও সে সবের সর্বোচ্চ কঠোর প্রয়োগ অন্যতম প্রধান গণদাবী, সন্দেহ নেই। এই অবস্থায় মন্ত্রিসভায় নতুন এই আইনের অনুমোদন অভিনন্দনযোগ্য। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভার একই বৈঠকে আরেকটি প্রয়োজনীয় আইন-‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত; শিশুর বাড়তি খাদ্য এবং তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) আইন-২০১৩’ এর খসড়ায়ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই আইনটিও যথাযথভাবে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দেশজুড়ে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার চলছে নির্বিবাদে ও মহাউৎসাহে। বিভিন্ন সময়ে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও আইন সময়োপযোগী না হওয়ায় বাস্তবে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় জনগণ ফলমূল, শাক-সব্জি, ভোজ্য তেল, শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। মানবদেহের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ও রঙ অবলীলায় মেশানো হচ্ছে খাদ্যসমাগ্রীতে। মানুষ সরল বিশ্বাসে এসব খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে নানা জটিল স্বাস্থ্য-সমস্যায় ভুগছে। পেটের পীড়া, আলসার, লিভার, কিডনির জটিলতা এবং এমনকি ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অসাধু খাদ্য প্রস্তুতকারী ও ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে আজ চরম অসহায় হয়ে পড়েছে ভোক্তাসাধারণ। বিশ্বে এমন দেশ বিরল, যে দেশে অস্বাভাবিক মুনাফার লোভে মানুষের খাদ্যে বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে বাজারজাত করা হয়। সামনে রোজা আসছে। ইফতার সামগ্রীতে প্রতি বছর নানা রকম বিষাক্ত পদার্থ ভেজাল দিতে দেখা গেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করার কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না। অতীতে ভেজালবিরোধী অভিযানে নামমাত্র শাস্তি, জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাদের গুরুতর অপরাধের মোটেই যথেষ্ট নয়। এতে করে তারা পুনরায় অপতৎপরতা শুরু করে এবং বহুগুণে মুনাফা উঠিয়ে নেয়। গুরুপাপে লঘুদ-ই দেশে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণকে উৎসাহিত করছে। এ কারণে বিভিন্ন সময় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী উঠেছে।
অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জনস্বাস্থ্যনাশক তৎপরতা থেকে বের করে আনা অপরিহার্য। তাদের কার্যকরভাবে প্রতিরোধের জন্য আইনের প্রয়োগ কঠোরতর হওয়া উচিত। খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে যারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। ফুটপাতের বা খুচরা বিক্রেতাদের ধরার মধ্যেই প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। এই প্রক্রিয়া হাজার বছর ধরে চালিয়ে গেলেও খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণ বন্ধ করা যাবে না। মূল হোতাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নামধাম ও শাস্তির বিবরণ প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হতে হবে। সামাজিকভাবে তাদের হেয় অবস্থান তুলে ধরতে হবে। কেননা যারা জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তারা প্রকৃতপক্ষে জাতির সঙ্গেই শত্রুতা করছে। আলোচ্য আইনের প্রয়োগসহ সার্বিক বিধি-ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। লোভের বশে দায়িত্ব থেকে ন্যূনতমও বিচ্যুত হলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকতে হবে। প্রতিটি বাজারে ভেজালবিরোধী কমিটি গঠন করে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেইসঙ্গে ফরমালিনসহ বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কুফল সম্বলিত পোস্টার টানাতে হবে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ভেজালযুক্ত খাদ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রচার মাধ্যমকেও এক্ষেত্রে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এই মুহূর্তে রমজানের ইফতারসামগ্রী ও ঈদের খাদ্যসামগ্রী যাতে সব ধরনের ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষতিকর রঙ থেকে মুক্ত থাকে, তার নিশ্চয়তা বিধানে এখনই সর্বোচ্চ কঠোর কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে। এই রমজানেই প্রমাণ করতে হবে, আলোচ্য আইন ভবিষ্যতে উপযুক্ত কঠোরতায় প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত পদার্থ মিশ্রণের চরম মানবতাবিরোধী তৎপরতা সম্পূর্ণ বন্ধে সক্ষম রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
সূত্র- দৈনিক ইনকিলাব

