ভর্তির ফি না কমিয়ে মেধা স্কোর কমানোর তদবিরে নেমেছেন বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর মালিকেরা। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেই শিক্ষার্থীদের এমবিবিএস বা বিডিএসে ভর্তি করানোর সুযোগ চান তাঁরা। এই দাবি আমলে নিয়ে দুটি সভাও করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন আবেদন করেছে, ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যেকোনো শিক্ষার্থীকেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। আর বাংলাদেশ বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন মালিকপক্ষ ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন নম্বর ১২০-এর পরিবর্তে ১০০ করার দাবি জানিয়েছে। এটা অনুমোদন করা হলে ভর্তি পরীক্ষায় শূন্য নম্বর পেয়েও পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে।
নিজেদের প্রস্তাবের ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের কর্মকর্তা মো. ইকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসিতে ১০০-এর মধ্যে প্রাপ্ত স্কোর ও ভর্তি পরীক্ষায় ১০০-এর মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে কমপক্ষে ১২০ হলেই কেউ ভর্তির আবেদন করতে পারবেন।
এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৪ পেলে মেডিকেল ও ডেন্টালে ভর্তির আবেদন করা যায়। দুই পরীক্ষায় জিপিএ-৪ করে পেলে তাঁর স্কোর দাঁড়ায় ৮০ (এসএসসিতে প্রতি জিপিএর জন্য ৮ এবং এইচএসসিতে ১২ ধরে)। আর দুটি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলে তার স্কোর হবে ১০০। ভর্তির জন্য লিখিত পরীক্ষা হয় ১০০ নম্বরের। জিপিএ-৪ পাওয়া প্রার্থীকে এখন লিখিত পরীক্ষায় কমপক্ষে ৪০ পেতে হয়। জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর ২০ নম্বর পেলেই ভর্তির জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হন। এখন ভর্তির সর্বনিম্ন নম্বর ১০০ করা হলে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীকে ভর্তির লিখিত পরীক্ষায় ০ পেলেও চলবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান শিক্ষাবর্ষে ১৬৬-এর ওপর যাঁরা স্কোর করেছেন, কেবল তাঁরাই সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরেছেন। ভর্তির সর্বনিম্ন স্কোর ১২০ হওয়ায় প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী পাস করেও সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের এই অংশ বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বিপুল ভর্তি ফির কারণে অধিকাংশের পক্ষে তা সম্ভব হয় না।
দেশে বর্তমানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬২টি। এতে আসনসংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এবার ভর্তি হয়েছে মাত্র চার হাজার শিক্ষার্থী। বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ১৮টি এবং আসনসংখ্যা প্রায় এক হাজার ২০০।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সূত্রগুলো জানায়, মেডিকেল কলেজে গড়ে ভর্তি ফি ১৫ লাখ টাকা। আর ডেন্টাল কলেজে ছয় লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূলত ভর্তির যোগ্য হয়েও এই বিপুল অঙ্কের টাকার জন্যই শিক্ষার্থীরা বেসরকারি কলেজে শিক্ষা নিতে পারছেন না। বেসরকারি কলেজগুলোর উচিত ভর্তির টাকা কমিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু তাঁরা নেমেছেন মেধা স্কোর কমানোর তদবিরে।
ভর্তি পরীক্ষার ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ১০ পাওয়া শিক্ষার্থীকেও ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল। এ নিয়ে ‘ভর্তির তথ্যই ভীতিকর’ শিরোনামে প্রথম আলোতে গত বছর ২৮ আগস্ট প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
জানতে চাইলে বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক আবু সফি মোহাম্মদ আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ভালো কলেজগুলোতে আসন খালি নেই। বেসরকারি কলেজগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ মেটাতে সরকার কেন মেধাহীন শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দেবে। নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদ সূত্র জানিয়েছে, মেডিকেল কলেজগুলোর মালিকপক্ষ মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করছে। তাদের দাবি, অধিকাংশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে সিট খালি পড়ে আছে। ভর্তির প্রয়োজনীয় স্কোর কমালে আসন পূর্ণ করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের ভর্তিসংক্রান্ত কমিটির সভায় এমবিবিএস ও বিডিএসে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২০। এখন এ ব্যাপারে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা হতে হবে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কোনো সভায়।
বাংলাদেশ বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন ১৮ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) বরাবর আবেদন করে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে মেধা স্কোর ১০০ করার অনুরোধ জানায়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গত ডিসেম্বর মাসের ২৬ ও ২৯ তারিখে দুটি সভা করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের বিরোধিতার কারণে সেই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এরপর ২ জানুয়ারি বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এক চিঠিতে বলেছে, ভর্তির স্কোর ১২০ করায় ৫০টির বেশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আসন শূন্য পড়ে আছে। তারা ‘এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সব ছাত্রছাত্রীকে’ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ দিতে অনুরোধ জানায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) এ বি এম আবদুল হান্নান ৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্যসচিবকে চিঠি দেন। তাতে সর্বনিম্ন মেধা স্কোর ১০৫ করার সুপারিশ করেন। এতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহরও সম্মতি আছে বলে বলা হয়। জানতে চাইলে আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব করেছি মাত্র। সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।’
আর সিফায়েত উল্লাহ বলেন, মেধা স্কোর না কমালে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির জন্য মেধা স্কোর ১২০ রাখার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত হবে না। এতে মেধাহীনেরা মেডিকেল ও ডেন্টালে ভর্তি হবে আর দুর্নীতিবাজেরা লাভবান হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

