বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা গতকাল শনিবার রাতে ও আজ রোববার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছেন। এসব ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ঠাকুরগাঁওয়ে দুজন, ফেনীতে দুজন, লক্ষ্মীপুরে একজন, রংপুরে দুুজন, নীলফামারীতে দুজন ও দিনাজপুরে একজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে পার্বতীপুরে হামলাকারীদের কবল থেকে বাঁচতে দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে মারা যান আনসারের এক সদস্য। একই উপজেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আরেকজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের হামলায় এক সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াতের এক কর্মী নিহত হয়েছেন।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধির পাঠানো খবর:
গাইবান্ধা: আজ বেলা তিনটার দিকে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মম্মথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা হামলা চালান। তাঁরা এ সময় বিদ্যালয়ের দরজা, জানালা ভাঙচুর করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা বাধা দিতে এলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। এতে শাহাবুল (৩৫) নামের জামায়াতের এক কর্মী নিহত হন। আহত হন ১৫ জন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন ‘প্রথম আলো’কে জানিয়েছেন, সংঘর্ষে শাহাবুল নামের একজন মারা গেছেন। এখন পরিস্থিতি শান্ত।
ঠাকুরগাঁও: রাত পৌনে নয়টার দিকে বিএনপি-জামায়াতের ১৫০-২০০ কর্মী লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সদর উপজেলার মোলানী ছেপড়িকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে হামলা চালান। প্রথমে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে চকলেট বোমা ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেন। পরে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা ভোট গ্রহণে নিয়োজিত লোকজনের ওপর হামলা চালান। হামলায় সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার জোবায়দুল হক, গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম ও দুই পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে কর্মরত চিকিত্সক জোবায়দুল হককে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি সদর উপজেলার সালন্দর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের পরিদর্শক।
অন্যদিক আজ দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার বাসুদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা হামলা চালালে কর্তব্যরত পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছোড়ে। এতে হারুণ (৪০) ও একই গ্রামের জয়নাল (৩০) নামের দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় বিএনপির এক কর্মী নিহত হন।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর): উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের বছীরবাণিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আজ সকালে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় কয়েক শ লোক। তারা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তা, পুলিশ ও আনসারের সদস্যদের মারধর করতে থাকে। এ সময় আনসার সদস্য আবদুল ওয়াহেদ প্রাণভয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দৌড়াতে থাকেন। মাইল খানেক দূরে ছোট যমুনা নদীর পাড়ে গিয়ে পড়ে যান তিনি। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউনিয়ন আনসার-ভিডিপি সূত্র ওয়াহেদের মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। হামলার ঘটনার পর ওই ভোট কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের যশাই উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ১১টার দিকে একই কায়দায় হামলা হয়। হামলাকারীরা ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম পুড়িয়ে দেয়। হামলায় নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন। কেন্দ্রটির ভোট বাতিল করা হয়েছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার মন্মথপুর কো-অপারেটিভ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটবিরোধী কয়েক শ লোক দফায় দফায় হামলা চালায়। হামলার একপর্যায়ে ভোটবিরোধী দলে থাকা মাসুদ রায়হান (২২) গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। মাসুদ যুব জাগপা পার্বতীপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। তাঁর বাবার নাম গোলাম রসুল। তাঁর বাড়ি মোমিনপুর ইউনিয়নের হয়বত্পুর গ্রামে। মাসুদ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ফেনী: সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আজ সকালে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত হন। গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন উত্তর চরচান্দিয়া ওয়ার্ড যুবদলের সহসভাপতি জামশেদ আলম (২৭) এবং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি শহীদুল্লাহ (২৫)।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের একদল কর্মী-সমর্থক উত্তর চরচান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। তাঁরা পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর করেন। এ সময় পুলিশের গুলিতে পাঁচজন গুলিবিদ্ধসহ ১২ জন আহত হন। সোনাগাজী হাসপাতালের নেওয়ার পথে জামশেদ আলম এবং ফেনী সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পর শহীদুল্লাহ মারা যান।
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) পরিতোষ ঘোষ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
লক্ষ্মীপুর: রামগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের মাছিমপুর উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ও পেপার ছিনতাই করার সময় বেলা একটার দিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. রুবেল (২২) নামের একজন নিহত হয়েছেন।
এ সময় স্থানীয় লামচর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আরিফ হোসেন, রামগঞ্জ থানা পুলিশের (এসআই) মো. ফরহাদ হোসেনসহ অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন। আহত ব্যক্তিদের রামগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ শরীফুল ইসলাম খান জানান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন।
তবে রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, পুলিশের গুলিতে শিবিরের কর্মী রুবেল নিহত হন।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মাহাবুবুল আলম জানান, বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ৮১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।
নীলফামারী: আজ সকাল ১০টার দিকে জলঢাকা উপজেলার কইমারী ইউনিয়নের গাবরোল ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে জামায়াতের কর্মী মমতাজ আহমেদ (৫০) নিহত হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একটি সূত্র প্রথম আলোকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল দিবাগত রাত ১২টার পর ডিমলা উপজেলার ব্যাপারিতলা আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জাম পুড়িয়ে দিতে গেলে পুলিশের গুলিতে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তি নিহত হন।
তাঁর বাড়ি উপজেলার খালিশা চাপানি গ্রামে। তিনি রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইংরেজি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ প্রথম আলোকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
রংপুর: রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে ব্যালট বাক্স ছিনতাইসহ কেন্দ্র দখল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে দুই কেন্দ্রে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মেরাজুল ইসলাম (৩৫) ও হাদিউজ্জামান (১৬)।
গতকাল দিবাগত রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে পীরগাছার পারুল ইউনিয়ন দেউতি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মেরাজুল ইসলাম ও একই ইউনিয়নের মেকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হাদিউজ্জামান নিহত হয়। সে একটি মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর ছাত্র।
পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন জানান, গতকাল জামায়াত-শিবির কেন্দ্র দখল করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। এতে দুজন নিহত হন। তাঁরা জামায়াতের কর্মী।
দিনাজপুর: স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ১৮ দলের নেতা-কর্মীরা রাতে সদর উপজেলার নশিপুর বাজারে বনভোজন করেন। রাত ১২টার দিকে তাঁরা পেট্রলবোমা ও ককটেল ফাটিয়ে নশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে থেকে ব্যালট পেপার, বাক্সসহ ভোটের সরঞ্জামে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কর্তব্যরত পুলিশ ও আনসার সদস্যরা বাধা দিলে হামলাকারীরা তাঁদের মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে বাবুল হোসেন (৩৫) নামে বিএনপির একজন কর্মী ঘটনাস্থলে নিহত হন। হামলাকারীরা বাবুলের লাশ নিয়ে যান। সকাল থেকে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত আছে।
বাবুলের বাড়ি ১ নম্বর চেহেলগাজী ইউনিয়নের একবারপুর জালিয়াপাড়া গ্রামে।
সূত্র - প্রথম আলো

