১০ টি প্রধান প্রদাহ নাশক ভেষজ উদ্ভিদ
28 October,13
Viewed#: 544
যদি আপনি ভাল কোন প্রদাহ নাশক ভেষজের খোঁজ করেন তবে এ নিবন্ধটি আপনার কাছে বেশ প্রয়োজনীয় মনে হবে। অসংখ্য ভেষজ উদ্ভিদ আছে যেগুলি বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার নিরাময়ে বেশ সহায়ক প্রমানিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে, প্রদাহ, সংক্রমণ, রক্ত জমাট বাঁধা এবং এরকম আরও অনেক কিছু। এছাড়াও, কৃত্রিম ঔষধ—যেগুলি আমরা ঔষধের দোকান থেকে কিনে থাকি---সেগুলির মতই এদের মধ্যে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তবে অবশ্যই তা একেবারেই কম। নীচে আপনার ব্যবহার উপযোগী ১০ টি অন্যতম প্রদাহ নাশক ভেষজ উদ্ভিদের উপকারিতা, ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় গুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হল।
প্রদাহ কি?
অন্যতম প্রদাহ নাশক ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা শুরুর পূর্বে আমাদের বলা প্রয়োজন আসলে প্রদাহ কি, এর কারণ এবং এ সংক্রান্ত বিষয়াবলী। বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলতে গেলে প্রদাহ এমন একটি অবস্থা যা ক্ষত, জ্বলুনি, সংক্রমণ এবং অন্যান্য বাহ্যিক পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। আমরা সাধারণত প্রদাহকে ত্বকের সমস্যার সাথে সম্পর্কিত করে দেখি। যখন আপনি ত্বকে লালচে ফোলা মত কিছু দেখেন তখন একে আমরা প্রদাহ (inflammation) বলতে পারি। সাধারণত একে সহজ ভাবে নেয়া হয়। কিন্তু অনেক সময় অভ্যন্তরীণ প্রদাহ হতে পারে যা মারাত্মক ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শ্বেত রক্তকনিকার থেকে নির্গত prostaglandins এবং cytokines নামক কেমিক্যালের কারণে শরীরে প্রদাহজনিত উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এ অবস্থা এন্টিবায়োটিক এবং corticosteroids ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। প্রদাহের অনেক কারণ আছে। এটি অ্যালার্জি, পেশীর ক্ষত, রক্ত জমাট বেধে যাওয়া এবং এ জাতীয় অনেক কারণে সুত্রপাত হতে পারে। এর ফোলা ভাব সাধারণত সহজেই সেরে যায়, কিন্তু তীব্রভাবে আক্রান্তের কারণে অনেক সময় তা সহজে সারে না। সাধারণত যেটি ঘটে থাকে তা এরকম, প্রথমে ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসা। এরপর রক্তনালির lumen এর সংকোচন যা রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এরপর ফুলে যাওয়া, জীবাণুর ধ্বংস এবং টিস্যুর সেরে ওঠা। এ পর্যায়ে এসে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠে।
হলুদ
এশিয়ান এবং মেক্সিকান খাবার তৈরিতে এটি ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হয়। Tendonitis(পেশীর প্রদাহ), arthritis(গেঁটে বাত), এবং অন্যান্য স্বপ্রতিরোধী (autoimmune) অসুস্থতার মত প্রদাহজনিত রোগের নিরাময়ের জন্য অভিজ্ঞজনেরা হলুদ ব্যবহারের সুপারিশ করেন। হলুদের নির্যাসের নির্দেশিত মাত্রা হল ৪০০ মি.গ্রা. থেকে ৬০০ মি.গ্রা. যা দৈনিক তিন বারে গ্রহণ করা যেতে পারে। মানব স্বাস্থ্যে হলুদের প্রভাবের উপর অনেক গবেষণা করা হয়েছে। Oregon State University এর গবেষকরা বের করেছেন যে হলুদ arthritis নিরাময় করতে পারে। ফোলা এবং ব্যাথা যা প্রদাহের সাথে হয়ে থাকে হলুদ তা নিরাময় করে থাকে।
আদা
অনেক দেশে বিশেষত, এশিয়াতে আদা প্রাকৃতিক প্রদাহ নাশী ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ১৯৯২ সালে ডেনমার্কের Odense University কর্তৃক পরিচালিত গবেষণাতে দেখা গেছে যে প্রদাহজনিত কারণে অসুস্থ অনেক রোগীরা আদা সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। উল্লেখিত গবেষণাতে ৭৫% অংশগ্রহণকারী যারা আদা সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করেছেন জানিয়েছেন যে আদা খাওয়ার পরে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। Journal of Medical Food প্রকাশিত অন্য একটি নিবন্ধে আদার প্রদাহ নাশী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটি গিলে খাওয়া যেতে পারে বা চা অথবা অন্য খাবারের সাথে খাওয়া যায়। আদার কারণে কিছু অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা যেতে পারে, যেমন মাথা ব্যাথা, বমিভাব এবং ডায়রিয়া।
Boswellia
একে ভারতীয় frankincense (ধূপ জাতীয় উদ্ভিদ) ও বলা হয়। প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ গুলির মধ্যে এটি সন্ধি ব্যাথা এবং rheumatoid arthritis এর নিরাময়ে বেশ ভাল কাজ করে। এটি প্রাকৃতিক চিকিৎসায় সম্পূরক হিসাবেও ব্যবহার করা হয়। ২০০৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণাতে দেখা গেছে যে cytokine যা প্রদাহ বৃদ্ধি করতে পারে তা ধ্বংস করে তীব্র প্রদাহের চিকিৎসাকে সফল করতে Boswellia বেশ কার্যকরী। Non-steroidal প্রদাহ নাশী ঔষধ বা NAD এর মত Boswellia পাকস্থলীতে কোনরূপ জ্বলুনির কারণ হয় না। এই ভেষজ উদ্ভিদটি বিভিন্ন ভাবে boswellic acid উৎপাদন করে যা প্রদাহ কমায়। প্রথমত, এটি রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি শ্বেত রক্তকনিকা রক্ষা করে টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এবং শেষ পর্যায়ে, শরীরে প্রদাহ উৎপন্নকারী কেমিক্যাল নিঃসরণে বাধা দেয়।
Rosemary
Rosemary একটি জনপ্রিয় মশলা যা দুনিয়া ব্যাপী রন্ধন প্রণালীতে ব্যবহৃত হয়। এ চিরসবুজ গুল্মটি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হয়। খাবারে স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এটি চায়েও ব্যবহৃত হয়। এই ভেষজটি প্রদাহ নাশী বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বলবর্ধক, ঘাম বৃদ্ধিকারক এবং বলবর্ধনকারী বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। একটি অতি সাম্প্রতিক গবেষণাতে দেখা গেছে যে এর উদ্দীপক এবং ব্যাথানাশী প্রভাবও আছে যা এর থেকে প্রাপ্ত তেলে বেশী পাওয়া যায়। Rosemary এর প্রদাহ নাশী বৈশিষ্ট্যের জন্য একে flavonoids এবং rosemarinic এসিডে রূপান্তরিত করা হয়।
রসুন
এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ যা আপনি সর্বদাই রান্নাঘরে দেখতে পাবেন। রসুনকে একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং অনেক দেশে নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার নিরাময়ে ব্যবহার করা হয় যার মধ্যে আছে sinus infection এর মত রোগ। প্রকৃতপক্ষে এর পেনিসিলিন এর মত একই ধরণের কার্যকারিতা রয়েছে। Rosemary এর মত রসুন ও একটি স্বাস্থ্য টনিক। cytokines যা প্রদাহ বাড়ায় সেটির রূপান্তর করে বলে রসুন প্রদাহ নাশী চিকিৎসার উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই তীব্র স্বাদযুক্ত এবং গন্ধযুক্ত ভেষজটি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, সাধারণ ঠাণ্ডা এবং কোলেস্টেরল এর চিকিৎসায়ও বেশ উপকারী পাওয়া গেছে।
যষ্টিমধু (Licorice)
আমাদের অনেকের কাছেই যষ্টিমধু ক্যান্ডি হিসাবে পরিচিত, প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ হিসাবে নয়। এই উদ্ভিদটি অনেক দেশে ব্যাপক ভাবে ঔষধ হিসাবে পরিচিত যা অন্যান্য ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যষ্টিমধু বিষণ্ণতা বিরোধী, আলসার বিরোধী, ছত্রাক বিরোধী এবং রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধিকারক হিসাবেও বিবেচিত হয়। এই ভেষজটি অ্যাজমা, লিভার সমস্যা, ছত্রাকজনিত এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, আর্থারাইটিস, প্রোস্টেটের বৃদ্ধি, জিঞ্জিভাইটিস, দাঁতের সমস্যা, এবং আরও অনেক রকমের রোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়। এই ভেষজটি উচ্চ মাত্রায় flavonoids সমৃদ্ধ যা একে প্রদাহ নাশী করে তুলেছে। এছাড়াও, গবেষণাতে এটি দেখা গেছে যে বেশী মাত্রায় যষ্টিমধু খেলে হৃদস্পন্দন বাড়াতে পারে, শ্বাসকষ্ট কমাতে পারে এবং অন্যান্য হৃদপিণ্ডের সমস্যাতে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
ঝাল মরিচ (cayenne)
এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ যা রক্ত প্রবাহ বাড়াতেও বেশ উপকারী। ঝাল মরিচের গুঁড়া ভিটামিন B, B কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন C তেও সমৃদ্ধ। এতে উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়াম এবং পটাশিয়াম আছে যা হৃদপিণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এটা বলা হয় যে Arthritis, post herpetic neuropathy, psoriasis এবং ক্যানসার চিকিৎসার জন্য এই ভেষজটি বেশ উপকারি।
দারুচিনি
আমরা এই ভেষজটি কফিতে দিতে পছন্দ করি এবং কেক, muffins এবং অন্যান্য মিষ্টি দ্রব্যতে সুগন্ধ আনার জন্য ব্যবহার করি। রান্না বিষয়ক উপকারিতা ছাড়াও এটি বিভিন্ন ভাবে আমাদের শরীরকে আরও সুস্থ্য রাখতে সহায়তা করে। নতুন গবেষণাতে এটি জানা গেছে যে দারুচিনি প্রদাহের ঝুঁকি কমায়। বেশী মাত্রায় চর্বিযুক্ত খাবার অভ্যন্তরীণ প্রদাহের কারণ হতে পারে যা পরবর্তীতে হৃদরোগের দিকে মোড় নিতে পারে।
Parsley
সকল প্রদাহ নাশী ভেষজের মধ্যে Parsley ভিটামিন এবং খনিজে বেশ সমৃদ্ধ। এটি ভিটামিন A, B, C এবং K তে একেবারে ভরপুর। দীর্ঘদিন ধরে Parsley কিডনি সমস্যা, ব্যাথাযুক্ত রজঃস্রাব, হজমের গোলমাল ইত্যাদির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই জনপ্রিয় মশলাটি rheumatoid arthritis এবং নির্দিষ্ট রকমের ক্যানসারের সূত্রপাত প্রতিহত করতেও বেশ কার্যকর মনে করা হয়। এর মধ্যে অবস্থিত পুষ্টি উপাদানের কারণে এই ভেষজটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রদাহ বিরোধী চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। গবেষণাতে দেখা গেছে যে parsley যখন asparagus এর সাথে একসাথে ব্যবহার করা হয় তখন তা প্রদাহ জনিত সমস্যার নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে থাকে।
পুদিনা (Basil)
আমাদের তালিকার শেষ অন্যতম প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ হল পুদিনা যদিও এটির উপকারিতা কম নয়। অনেক ডাক্তার arthritis এ আক্রান্ত রোগীদের তাজা পুদিনা খাওয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে থাকেন। এই সুগন্ধি ভেষজটি আমরা সাধারণত সালাদ হিসাবে এবং পাস্তাতে স্বাদের জন্য ব্যবহার করে থাকি।
এ সকল প্রদাহ নাশী ভেষজ উদ্ভিদ সমূহ একজন অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যবিদের তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা উচিত। যদি আপনি বর্তমানে কোন ঔষধ গ্রহণ করে থাকেন তবে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে নিন আপনি কি সিনথেটিক ঔষধের সাথে এ সকল প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদান গ্রহণ করতে পারেন কিনা। যদি আপনি খেয়াল করেন যে কোনরকম খারাপ ধরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে যেমন চুলকানি, মাথা ব্যাথা, বমিভাব এবং অন্য কোন রকম অস্বস্থিকর অবস্থা তবে সাথে সাথেই তা গ্রহণ বন্ধ করে দিতে হবে এবং অন্য চিকিৎসায় যেতে হবে।