
পুষ্পরেণু কী : পুষ্পরেণু শব্দটি এসেছে টংরেনি পোলেন থেকে। পোলেন প্রকৃত পক্ষে গ্রিক শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র ফুল। উদ্ভিদের বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে পুষ্পরেণুর মাধ্যমে পরাগায়ন একটি প্রয়োজনীয় পদ্ধতি।
কিছু উদ্ভিদ সামান্য পরিমাণে পুষ্পরেণু উৎপাদন করে। এদের ক্ষেত্রে পরাগায়ন ঘটে মৌমাছি এবং পাখির মাধ্যমে। অন্য উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটে মূলত বাতাসের মাধ্যমে। এসব উদ্ভিদ পুষ্পরেণু উৎপাদন করে অনেক বেশি পরিমাণে। বাতাসের মাধ্যমে পুষ্পরেণু অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যালার্জির প্রকোপ এ সময়ে বেড়ে যায়। গাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও রোগীরা আক্রান্ত হতে পারে বায়ুবাহিত পুষ্পরেণু দ্বারা। অনেক আগাছা থেকে পুষ্পরেণু এসে অ্যালার্জি আক্রান্ত ব্যক্তির উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। সেগুলোর মধ্যে আছে- পেনিটারি আগাছা-এর অন্য নাম 'অ্যাজমা আগাছা'। এ আগাছা এসেছে ইতালি থেকে। পিটারসনের অভিশাপ-দেখতে প্রচুর ফুল বিশিষ্ট এ আগাছার জন্মস্থান ইংল্যান্ড।
পুষ্পরেণু থেকে হে ফিভার : হে ফিভার অন্য নাম হচ্ছে সিজনাল অ্যালার্জিকরাইনাইটিস। আগে মনে করা হতো খড় বা পেঘ্রাণ থেকে এ রোগের উৎপত্তি। এ রোগদেখা দেয় পুষ্পরেণু শরীরের প্রবেশের শরীরের রোগ প্রতিরোধমূলক শক্তিরপ্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। আক্রান্ত হয় চোখ এবং নাকের বাতাস চলাচলের রাস্তা।উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে অবিরাম নাক দিয়ে পানি পড়া, চুলকানি, নাকবন্ধ হয়েথাকা, শ্বাস কম, চোখ থেকে পানি ঝরা, কান, গলা এবং মুখের তালুতে চুলকানি।রোগী প্রচ- ক্লান্তিক অনুভব করে এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হয়প্রচ-রকম। হে ফিভার মানুষকে অকার্যকর করে! দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়াতে প্রতি ৫ জনের ১ জন এ রোগে আক্রান্ত। এর ফলে সাইনাসের প্রদাহ বেড়ে যায়। রোগীর প্রচ- ক্লান্তি অনুভব করে। আবার নিদ্রাহীনতায় ভোগে। আক্রান্ত শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। বয়স্করাও কর্মস্থলে যেতে পারে না ফলে কর্মদিবস নষ্ট হয়। অ্যাজমা রোগীরা হে ফিভারে আক্রান্ত হলে রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।
পুষ্পরেণু অ্যাজমার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয় : হে ফিভার আক্রান্ত রোগী এক সময় শ্বাস কষ্ট অনুভব করেন। ফলে ধারণা ভুল! প্রকৃত পক্ষে পুষ্পরেণু অ্যাজমার প্রকোপও বাড়িয়ে দেয়। ছোট ছোট পুষ্পরেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করে। ফলে উপসর্গ তৈরি হয়। একজন রোগী একই সঙ্গে অ্যাজমা এবং হেফিভারে আক্রান্ত হতে পারেন।
পরাগায়নের ঋতু কয়েক মাস ধরে থাকে : উদ্ভিদের প্রকারভেদে পরাগায়ন ঋতু ভিন্নভিন্ন হতে পারে। যেমন-বড় বৃক্ষে পরাগায়ন হয় শীতের শেষে এবং বসন্তের শুরুতে।ঘাসের পরাগায়ন হয় তার পরে। এবং আগাছা থেকে পরাগায়ন হয় আগষ্ট থেকে মে মাস পর্যন্ত। যে অঞ্চলে বাতাস প্রবাহ বাধা কম সেখানে পুষ্পরেণু বেশি হয়।
সঠিক রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন : রোগের খুঁটিনাটি ইতিহস জানা প্রয়োজন।যেমন-উপসর্গ শুরুর সময় কখন, এলাকায় কোন ধরনের গাছপালা বেশি, সেইসঙ্গে এটাওজানতে হবে যে, সাপ্তাহিক ছুটিতে অন্যত্র বেড়াতে গেলে উপসর্গ কমে কিনা।ইতিহাস জেনে নেয়ার পর অ্যালার্জি পরীক্ষা করতে হবে স্কিন প্রিক টেস্ট বারক্তের রাস্ট পরীক্ষা করা হয় সচরাচর। পরীক্ষায় সেই সমস্ত অ্যালার্জেন ব্যবহৃত হয় যেগুলো রোগীর বাসস্থান এবং কর্মস্থলের আশপাশে পাওয়া যায়।পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে রোগের ইতিহাস মিলিয়ে ডাক্তার নির্ধারণ করবেন রোগীরসঠিক অ্যালার্জি।
পুষ্পরেণু থেকে মুক্ত থাকার কিছু টিপস্ : দুপুর পর্যন্ত ঘরে থাকুন দুপুরের পরে বাতাসে পুষ্পরেণুর পরিমান অপেক্ষাকৃত কম হয়। ঝড়ো দিনে বা প্রবল বাতাস থাকলে বাইরে যাবেন না।চোখ বাচানোর জন্য সানগ্লাস ব্যবহার করুন। বাগানের ঘাস কাটার কাজে নিয়োজেত হওয়া চলবে না। যদি কাটতেই হয়, তাহলে মাস্ক পড়ে কাজ করবেন। বাড়ির বাগানে এমন ধরনের গাছ বেছে বেছে লাগান যেগুলো এলার্জি তৈরি করে না। বাড়ির জানালা বন্ধ রাখবেন। বিশেষ করে রাস্তায় চলার সময় গাড়ির কাচ তুলে দেবেন। পরাগায়নের মৌসুমে বনভোজনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ছুটির দিনগুলো দূষণমুক্ত এলাকায়, বিশেষ করে নদী বা সমুদ্রতীরে কাটাতে পারেন। বাড়ির বাগানের কোন গাছ বা আগাছার কারনে এলার্জি হচ্ছে, তা নিশ্চিতরূপ জানতে পারলে গাছটি অপসারণ করুন। কাজ শেষে বাড়িতে ফিরেই গোসল করুন। সুযোগ পেলেই চোখে পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন। সঙ্গে সব সময় রুমাল বা টিস্যু পেপার রাখুন।
কার্যকরী চিকিৎসা এখন আপনার নাগালের মধ্যেই : উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারেরকাছে যান। যদিও শুধু ওষুধের দ্বারা এালার্জি নিরাময় করা যায় না। তবে গত ২০বছর আগের তুলনায় অনেক উন্নত ওষুধ আবিস্কৃত হয়েছে যেগুলো আপপনাকে কষ্ট থেকেমুক্তি দেবে। এই ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অনেক কম। আপনার ডাক্তারআপনাকে জানাবেন কিভাবে ওষুধের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। তাছাড়াযেসব ওষুধ সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী করে দেয় (যেমননাকের স্প্রে যে গুলো নাকের ছিদ্র পরিষ্কার রাখে) ডাক্তার সেগুলো এড়ানোরপরামর্শ দেবেন ্পনাকে।
এন্টিহিস্টামিন টেবলেট বা সিরাপ আপনার হাচি, চুলকানি বা চোখ জ্বলা কমাবে।তবে নাক বন্ধ হয়ে থাকা বা নাক দিয়ে সর্দি গড়ানোতে তেমন কার্যকারী হবে না। এন্টিহিস্টামিনের সুবিধা হচ্ছে, যখন প্রয়োজন তখন ব্যবহার করলেই হলো। এর জন্য কোর্স পূর্ণ করার প্রয়োজন নেই। এখন মিশ্র ওষুধেও পাওয়া যায়ং। যেমন এন্টিহিস্টামিনের সঙ্গে স্যুডোফেড্রিন। নাকের মিশ্র স্প্রে যথেষ্ট কার্যকারী। এদের মধ্যে থাকে-এন্টিহিস্টামিন-যা দ্রুত হাচি এবং চুলকানো বন্ধ করে। ইপরাট্রোপিয়াম ক্রোমাইড-নাক থেকে অবিরল পানি পড়ানো বন্ধ করে। ক্রোমাগ্লাইকেট-প্রদাহে খুবই কার্যকারী। এই ওষুধগুলো নিয়মিত এবং যথা নিয়মে ববহার করতে হবে। সেই সঙ্গে মেনে চলতে হবে কিছু উপদেশ। যেমন- চোখে মেডিকেটেড ড্রপ ব্যবহারে আরাম পাওয়া যায়। এতে থাকে উপশমী লুব্রিকান্ট, এন্টিহিস্টামিন এবং স্টেরয়েড। নিয়মিত ব্যবহারে প্রদাহ অনেক কমে যায়।
স্যুড্রোফেড্রিন টেবলেট নাকের রাস্তা পরিষ্কার করে দেয় এবং শুষ্ক রাখে। তবেএই ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যেসমন শরীরে মৃদু কম্পন, মুখেরঅসুবিধা, দুশ্চিন্তা এবং রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। সেই কারনে যাদের উচ্চ রক্তচাপআছে, তারা এই ওষুধটি খাবেন না।
কার্টিসোল (স্টেরয়েড) ইঞ্জেকশন না নেওয়াই উত্তম। ইঞ্জেকশনের ফলে মাত্র একবা দুই সপ্তাহের উপশম হয়। ফলে বার বার ইঞ্জেকশন দিতে হয়। এরপার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক মারাত্মক। সেই কারনে কার্টিসোল স্প্রে নেয়া ভালো। প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে রসুন বেশ উপকারী। অনেকে গরম পানির বাষ্প নাকে টেনে নেয়। কেউ কেউ লবণ-পানির মিশ্রণ নকে টানে। এ্যাজমা প্রতিরোধক অনেকক্ষেত্রে ভালো কাজ দেয়। এতে পুষ্পরেণুর পক্ষে সহজে এলার্জি সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না।
ইমিউনোথেরাপী ইঞ্জেকশন : ওষুধ দিয়ে উপসর্গগুলোর উপশম ঘটানো যায় মাত্র।নিরাময় হয় না। কোনো কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানী অন্য পথের কথা বলেন। তারা অল্পডোজে কিছুদিন পরপর এলার্জেন পুন করেন রোগীর শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে। এইইঞ্জেকশন দিতে হয় অনেক দিন ধরে। কখনো মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর। তবেএই বিষয়ে বিশষজ্ঞ বিকিৎসক ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এই ইঞ্জেকশন প্রদানেরসিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সূত্র - যায়যায়দিন

