বাঙালি দিন দিন ফ্যাশনসচেতন হয়ে উঠছে। আর সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্য তো আছেই।তাই পয়লা ফাল্গুনে পোশাকে থাকে হলুদ আর বাসন্তির ছোঁয়া। পয়লা বৈশাখেলাল-সাদা। ভালোবাসা দিবসসহ বিভিন্ন দিবসেও থাকে নানান রঙের খেলা। তবে এবারবেছে নিতে হবে গোলাপি রংকে। গোলাপি শাড়ি, সালোয়ার, টি-শার্ট, যদি এসব নাথাকে তো গোলাপি ফিতার ব্যাজ হলেও চলবে।
সব রেখে গোলাপি কেন—এ প্রশ্নজাগতেই পারে। গোলাপি রঙে নিজেকে এবং চারপাশে সাজিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেফ্যাশনের চেয়েও অনেক বড় উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, গোলাপি ফিতা হচ্ছে স্তনক্যানসারের বিরুদ্ধে সচেতনতার প্রতীক।
১০ অক্টোবর দেশে প্রথমবারের মতোপালিত হবে স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস। বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতাফোরাম এ দিবসের উদ্যোক্তা। দিবসটিতে গোলাপি আভায় নিজেকে ও চারপাশ সাজিয়েনেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সেন্টার ফর ক্যানসার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের (সিসিপিআর) নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ; আহছানিয়া ক্যানসার হাসপাতাল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইয়াং উইমেন ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াইডব্লিউসিএ), বাংলাদেশ; এডুকেশন ফর হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, অপরাজিতাসহ মোট ১১টিসংগঠন এ ফোরাম গড়ে তুলেছে। ফোরাম ১০ অক্টোবর সকাল সাতটায় শাহবাগের বটতলাথেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত শোভাযাত্রা, বেলা তিনটায় ধানমন্ডিররবীন্দ্রসরোবরে সমাবেশ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এরবাইরে পোস্টার, লিফলেট তো আছেই।
স্তনক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাপী বিভিন্নকর্মসূচি পালিত হয়। বাংলাদেশে এবার পালিত সচেতনতা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘জেগে উঠুন, জেনে নিন’। ‘থিংক পিঙ্ক’-এর আলোকে সবকিছুতেই থাকবে গোলাপিরআভা।
স্তনক্যানসার নারীর পাশাপাশি পুরুষেরও হতে পারে। তবে শতাংশের হিসাবেনারীরাই বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারের ও নিজের অবহেলা, কুসংস্কার, লজ্জা, ভয়—এসব কারণে দেশের অসংখ্য নারীর স্তন ক্যানসার শনাক্তহতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। অবিবাহিত মেয়ের ক্ষেত্রে কাজ করে বিয়ে না হওয়ার ভয়।তাই নিজের শরীরে, স্তনে কোনো কিছু বাসা বেঁধেছে কি না, তা দেখারও ফুরসতনেই। কিছুর অস্তিত্ব পেলেও তা অন্যকে জানানোর ক্ষেত্রে থাকে হাজারোদ্বিধা।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপককামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এ হাসপাতালে আসা মোট নারী রোগীর মধ্যে বর্তমানেস্তন ক্যানসার ১ নম্বরে আছে। মানুষের মধ্যে আগের চেয়ে সচেতনতা কিছুটাবেড়েছে। স্তনে কিছু পরিবর্তন দেখলেই অনেকে দেখাতে আসছেন। আর সচেতন হলেই এরোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার যে সুফল তা শোনালেন রোকেয়ারুমি। ২০১০ সালে রোকেয়া রুমির মেয়ের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখনই প্রথমসমস্যাটি চিহ্নিত হয়। মেয়েই একদিন বলে, ‘আম্মু, তোমার এখানে কী যেন হয়েছে।’ আগে থেকেই রোকেয়া স্তনের মধ্যে একটি গুটির অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলেন। মেয়েওযখন একই কথা বলে, তখন অনেকটা হেঁয়ালি করেই তিনি চিকিত্সকের কাছে যান এবংবলতে গেলে প্রাথমিক পর্যায়েই তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে।
এডুকেশন ফর হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়ারুমি বলেন, ‘স্তনক্যানসার নিয়ে কিছুটা জানতাম। তবে আমার নিজের হবে তা কখনোভাবিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারের সবার সহায়তায় চিকিত্সাকরে আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। অথচ আমার চোখের সামনেই কতজনকে স্তন ক্যানসারেরবীভত্স অভিজ্ঞতা নিয়ে মরে যেতে দেখলাম।’
রোকেয়া রুমির সংগঠন আগে শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেও ২০১১ সাল থেকে ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কিছু তথ্য
মা, খালা ক্যানসারে আক্রান্ত বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে, বেশি মোটা হলে, ২০ বছর বয়সের আগে বিয়ে হলে, ৩০ বছরের পর প্রথম সন্তানের জন্ম হলে, সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ালে নারীদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।নিঃসন্তান নারী, বিড়ি, সিগারেট, তামাক, জর্দাসেবনকারী নারীরাও এই ঝুঁকিরমধ্যে আছেন। কম শারীরিক পরিশ্রম, দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগেভোগা, জন্মনিয়ন্ত্রণের খাবার বড়ি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি বেড়েযায়।
২০ বছর বয়স থেকেই মেয়েদের নিজের স্তন পরীক্ষার অভ্যাসটি গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিত্সকেরা বলেন, প্রতি মাসে মাসিক হওয়ার দশম দিনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েহাতের নিচ থেকে নিয়ে পুরো স্তন চাপ দিয়ে দেখে পরীক্ষা করতে হবে যে হাতেকোনো শক্ত চাকা বা পিণ্ড টের পাওয়া যায় কি না। যাঁদের মাসিক বন্ধ হয়েছে, যাঁরা সন্তানসম্ভবা বা যাঁরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তাঁরা মাসেরপ্রথমে যেকোনো দিন স্তন পরীক্ষা করাতে পারেন।
পরীক্ষা করানোর সময় লক্ষ করতে হবে—স্তনের আকৃতি, চামড়ার রং ও বোঁটায়কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে কি না। স্তনের ওপরের চামড়া কমলালেবুর খোসার মতোকুঁচকে গেলে বা টোল পড়া মনে হলে, স্তনের বোঁটা থেকে রস বের হলে, বোঁটারচারপাশে ফুসকুড়ি দেখা দিলে বা স্তনের বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যেতে নিলেদ্রুত চিকিত্সক দেখাতে হবে।
প্রতি মাসে মাসিক শেষে নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার পাশাপাশি ২০ থেকে৩৯ বছর বয়সে কমপক্ষে তিন বছর পর পর এবং ৪০ বছর থেকে প্রতিবছর একবার স্তনপরীক্ষা করা এবং চিকিত্সকের পরামর্শে নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করাসহ অন্যান্যনিয়ম মানতে হবে। তবে চিকিত্সকেরা বলছেন, স্তনের সমস্যা মানেই ক্যানসার নয়। এক্ষেত্রে ভয় না পেয়ে দ্রুত চিকিত্সকের পরামর্শমতো নিশ্চিত হওয়াটা জরুরি।
সূত্র - প্রথম আলো

