
সৃষ্টির লগ্ন থেকে মানুষ বিভিন্ন প্রকার জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ ত্রুটিগুলো অতি সামান্য থেকে অতি জটিল সমস্যা হতে পারে। আদি যুগে গ্রিসে কোনো বাচ্চা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে তারা সেই বাচ্চাকে উঁচু পাহাড় থেকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করত। কোনো কোনো সময় তারা সেইব ত্রুটিযুক্ত বাচ্চা নদীতে ফেলে দিত এবং কুমির খেয়ে ফেলত। ক্যাথারজিন সম্প্রদায় ত্রুটিযুক্ত বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করত।
বর্তমান যুগে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও মেডিকেল সায়েন্সের ব্যাপক উন্নতির ফলে কোনো বাচ্চা যেন ত্রুটিপূর্ণভাবে জন্মগ্রহণ না করে সে জন্য আগে থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাচ্চা যখন মায়ের পেটে থাকে তখন তার প্রথম তিন মাস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হয়। এ সময় গর্ভবর্তী মাকে ফলিক এসিড খাওয়ালে অনেক জন্মগ্রত ত্রুটি কমে যায়। আবার যেসব বাচ্চার মাতৃগর্ভেই ত্রুটি ধরা পড়ে যেমন কনজেমিটাল অ্যাথমেটিক ব্যান্ড, অসটিওজেমিক ইসপারফেকটল কনজেনিটাল জায়াফার্মেটিক হার্নিয়া ইত্যাদি। এসব জটিল রোগ ফিটাল সার্জারির মাধ্যমে সমাধান করা হয় এবং বাচ্চা পুরোপুরি সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করে। তবে কিছু কিছু কারণে আবার জন্মগত ত্রুটি বেশি হচ্ছে_ যেমন পরিবেশগত প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রেডিয়েশন হাজার্ড, গ্রিন হাউসের প্রভাব। কিছু কিছু ওষুধ গর্ভবতী অবস্থায় সেবন করলে জন্মগত ত্রুটি বেশি হয়।
যেসব জন্মগত ত্রুটি নিয়ে বাচ্চারা জন্মগ্রহণ করে তা হলো নিম্নরূপ_ * বাচ্চার মাথা খুব ছোট হতে পারে যাকে, অ্যানেন সেফালি বলে। * অথবা বাচ্চার মাথা খুব বড় হতে পারে, যাকে হাইড্রোসেফালাস বলা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে হাইড্রোসেফালাস পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব। * অনেক সময় বাচ্চারা ঠোঁটকাটা বা তালুকাটা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
এসব বাচ্চাকে দেখতে খারাপ লাগে এবং খাবার ও কথা বলার সমস্যা হয়। ঠোঁটকাটা অবস্থায় বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে তিন মাস পর এবং তালুকাটা বাচ্চাদের জন্মের ৯ থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে অপারেশন করতে হয়। তালুকাটা বাচ্চাদের অপারেশন ১৮ মাসের পরে করলে কথা নাকের মধ্যে ঢুকে যায় (নাজাল ইনট্রিনেশান)।
কোনো কোনো বাচ্চার জন্মের পর গলায় সামনে ছোট টিউমার বা ফুটা থাকে, যাকে থাইরোগ্লোসাল সিস্ট বা ফিস্টুলা বলে। অপারেশনের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা হয়। কখনো কখনো বাচ্চা জন্মের পর পর মুখ দিয়ে প্রচুর লালা বের হয় এবং খাবার দিলে দম বন্ধ হয়ে আসে। সাধারণত গলায় খাদ্যনালি বন্ধ থাকলে এ অবস্থা হয়। কোনো কোনো সময় বাচ্চা জন্মের পর পর বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হয়। সাধারণত ডায়াফার্মেটিক হার্নিয়া বা ইভেনট্রেশন অব ডায়াফার্মা হলে এ অবস্থা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।
অনেক সময় বাচ্চাদের নাড়িতে সমস্যা থাকে যেমন ইনটেসটাইনাল অ্যাট্রোসিয়া বা স্টোনাসিস, হার্সপ্রঙ্ক ডিজিজ। এসব সমস্যা থাকলে বাচ্চা জন্মের পর পেট ফুলে যায়, সবুজ বলি করে এসব জটিল রোগ অপারেশনের মাধ্যমে ভালো করা যায়। কোনো কোনো সময় বাচ্চাদের পায়খানার রাস্তা থাকে না অথবা মেয়ে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মাসিকের রাস্তা দিয়ে পায়খানা আসে। এসব সমস্যা অপারেশনের মাধ্যমে ভালো করা হয়। কখনো কখনো বাচ্চাদের প্রস্রাবের থলি পেটের বাইরে থাকে এবং প্রস্রাব পেট দিয়ে ঝরতে থাকে। একে এক্সট্রোপি বস্নাডার বলে। এসব জটিল সমস্যা অপারেশনের মাধ্যমে ঠিক করা হয়। কোনো কোনো সময় ছেলে বাচ্চাদের প্রস্রাবের রাস্তা লিঙ্গের মাথায় না থেকে পেছনে থাকে। একে হাইপোস্পেডিয়াস বলে। এক থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে এসব সমস্যা অপারেশনের মাধ্যমে ঠিক করা উচিত। অনেক সময় ছেলে বাচ্চাদের টেসটিস অ-কোষের মধ্যে থাকে না, যাকে অ্যানডিসেনডেট টেসটিস বলে। সাধারণত ৬ মাস থেকে ৮ মাস বয়সের মধ্যে এই রোগীদের অপারেশন করতে হয়, না হলে এসব বাচ্চার ৮ মাসের পর চিরদিনের জন্য বাচ্চা জন্ম দেয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কোনো কোনো বাচ্চা জন্মের সময় পা বাঁকা থাকে, এসব বাচ্চা চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব।
জন্মগত ত্রুটি নিয়ে কোনো বাচ্চা কোনো পরিবারে জন্মগ্রহণ করুক তা কারোই কাম্য নয়। আর যদি কোনো পরিবারে এমন বাচ্চা জন্ম হয় তবে তাকে বোঝা মনে না করে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে হবে। বর্তমান যুগে মেডিকেল সায়েন্স যতদূর অগ্রসর হয়েছে এতে যে কোনো জন্মগত ত্রুটি চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
সুত্র - যায়যায়দিন

