মদ বা বিভিন্ন ধরনের নেশায় অস্বাভাবিক আচার-আচরণ করে যারা, তাদের সেই আচরণ কেউই সহ্য করতে চান না। যারা অ্যালকোহল খায় তাদের ২০ ভাগ এর অপকারিতার শিকার হয়, তারা নিজেদের সংযত করতে পারে না, অ্যালকোহলের পরিমাণ ক্রমেই বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিপদ ডেকে আনে। সুতরাং মদ বা অ্যালকোহল যে খায় তাকে অবশ্যই চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।
নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের নেশা ছাড়ানোর মানসিক প্রস্তুতি অনেক সময়ই থাকে না। তাদের মোটিভেট না করেই তাড়াহুড়ো করে চিকিৎসা করালে ফল পাওয়া কঠিন। অনেক ছেলেমেয়েই ‘নেশাবিহীন’ অবস্থায় সাময়িকভাবে নেশা ছাড়ার সদিচ্ছা বা মনোভাব প্রকাশ করে থাকে। মানসিক অবস্থার বিচার-বিবেচনা, পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা দিয়ে একজন সত্যিই নেশা ছাড়তে ইচ্ছুক কি না বুঝতে পারা যায়। অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো কোনো সময় ভুল হতেই পারে। তবুও সম্ভাব্যতার ওপর বিচার-বিবেচনা করেই এগোতে হয়।
অনেক সময় একজন নেশাগ্রস্ত ছেলে নেশার কবলে পড়ে নানারকম অজুহাত তৈরি করে। তারা বলে থাকে ‘কী করব, নেশা তো ছাড়তেই চাই, কিন্তু নেশা করি আর নাই করি বদনাম দেবেই।’ এ ছাড়া অজুহাত দেখায় ঝগড়াঝাটি, বিরক্তি, হতাশা প্রভৃতি কারণে অনেক নেশাগ্রস্ত ছেলেমেয়েই মনের উত্তেজনা, নেশা ছাড়ার জন্য সাময়িক কষ্ট, সাময়িক বিভিন্ন উপসর্গ সহজে মেনে নিতে চায় না। ‘অবচেতন’ মনকে ‘চেতন’ মন দিয়ে অনেক সময় অস্বীকার করলেও অবচেতন মন মনের অবদমিত আবেগ, গূঢ় ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করবেই।
নিজেকে কষ্ট দেয়া, নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা, মৃত্যুর আকাক্সা মানুষকে নেশায় আসক্ত হওয়ার পথে ঠেলে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত শত যুক্তিতর্ক বা বিচার-বিবেচনা তখন কোনো রকমে কাজ করে না বা করতে চায় না। মাদকদ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ এবং ব্যবহারের খারাপ ও ভয়াবহ পরিণতি কখনো কখনো নেশা আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের বিচলিত, বিভ্রান্ত, ভীত করে থাকে। নেশা শুরু করার পর ছাড়া যায় না অথবা নেশা বন্ধ করলে এত কষ্ট হয় যে, আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে প্রভৃতি কথা তাদের মনকে এতটাই বশীভূত করে যে, তারা কিছুতেই নেশা ছাড়ার জন্য চিকিৎসা করাতে রাজি হয় না। এ ছাড়া নেশার চিকিৎসা সম্বন্ধে ভুল ধারণা, অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতি, নেশা আক্রান্ত ছেলেমেয়ের পরিচয় গোপন না রাখা নেশার চিকিৎসাকে ব্যর্থ করে থাকে।
যারা চিকিৎসার সাথে জড়িত, তারা অনেক সময় নিজেদের প্রচার ও বাহবার জন্য সবার সামনে নেশাগ্রস্ত ও নেশা ছেড়েছে এমন ছেলেমেয়েদের পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। নেশায় আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের অভিভাবক বা মা-বাবা প্রথমে নেশার ব্যাপারটি জানতে বা বুঝতেই অনেকটা সময় নেন। অবশ্য এর জন্য তাদের দোষ দেয়া যাবে না, কারণ অন্যান্য অসুখ-বিসুখের মতো কতগুলো বাহ্যিক লক্ষণ থাকে, যা দিয়ে রোগীকে সহজেই চিনে নেয়া যায়। কিন্তু নেশার ব্যাপারে প্রথম থেকেই একটা অলিখিত লুকোচুরির খেলা শুরু হয়ে যায়। না জেনে মাদকদ্রব্য অনেক ছেলেমেয়েই প্রথমে ব্যবহার করে ও পরে আসক্ত হয়ে পড়ে। যে নেশা করছে সে যখনই বুঝতে পারে যে, তার নেশা করা অনেকের চোখেই ভালো নয়, তখনই সে লুকাতে চেষ্টা করে।
নেশা করা খারাপ এটা অনেক ছেলেমেয়েই জানে। তবুও ‘জেনেশুনে বিষপান’-এর মতো নেশার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং যে কিশোর-কিশোরী জেনেশুনেই নেশা শুরু করেছে সে নেশা ছাড়তেই বা চাইবে কেন? নেশার চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে
নেশার দ্রব্যের গুণাগুণ
একজনের নেশা করার ক্ষমতা
কত দিন ধরে ব্যক্তিটি আসক্ত হয়েছে
তার মানসিক অবস্থা কী পর্যায়ে আছে ইত্যাদির ওপর।
পরিবেশ পরিস্থিতির ওপরও মাদকাসক্তির চিকিৎসা অনেকখানি নির্ভর করে থাকে। একটি ছেলে বা মেয়ের বাড়ির পরিবেশ, বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, পাড়া-প্রতিবেশীর আচার-ব্যবহার তার নেশা করা বা নেশা ছাড়া দু’টিকেই যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অনেক সময় নেশা করতে গিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক দিক দিয়ে অনেক রকমের সমস্যার সৃষ্টি হয়। পাড়া-মহল্লায় বা বাড়িতে নেশা করার জন্য মারধর, ভয় দেখানো, ঘরে বন্ধ করে রাখা, পুলিশি হামলা, ঝামেলা অনেক সময় ছেলেমেয়েদের নেশা ছাড়ার থেকে নেশা করে যাওয়ার দিকে নিয়ে যায়। নেশার চিকিৎসা বিষয়টি যেমন জটিল, কষ্টসাধ্য, তেমনি অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন। তাই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ মনোবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। নেশার জিনিসের প্রতি আসক্তি কিন্তু একটা অসুখ যা শরীর-মন দুটোকেই অসুস্থ করে তোলে এবং কিশোর বা কিশোরীর সামাজিক জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনে।
নেশা ছাড়ানোর চিকিৎসার লক্ষ্য হলো: নেশার যে জিনিসের প্রতি আসক্তি তার ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা। নেশা বন্ধ করার জন্য যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় শারীরিক বা মানসিক তা বন্ধ করা।
সূত্র - দৈনিক নয়া দিগন্ত

