হার্ট অ্যাটাক পৃথিবীব্যাপি মানুষের মৃত্যুর প্রধানতম কারণ। হার্টঅ্যাটাকের আধুনিক উন্নত চিকিৎসা হলো অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনীঅ্যানজিওপ্লাস্টি (বেলুন ফুলিয়ে) করে ধাতব রিং (স্টেন্ট) বসিয়ে দেওয়া।এটাকে বলে প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি। এতে রোগীর মৃত্যুহার, মৃত্যুঝুঁকি ওহার্ট ফেইল্যুর অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
হার্ট অ্যাটাক কি?
হৃদপিন্ডের প্রধান তিনটি ধমনীরযে কোন একটির রক্তচলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই হার্ট অ্যাটাক বলে। ধমনীরদেয়ালে চর্বির ভেতর বিভিন্ন কারণে প্রদাহ (inflammation) শুরু হতে পারে।প্রদাহের ফলে চর্বির দলা নরম, ভঙ্গুর এবং এর আবরণ খুব পাতলা হয়ে পড়ে। একটাপর্যায়ে সঠিক চিকিৎসার অভাবে এই ভঙ্গুর চর্বির দলা ফেটে গিয়ে কয়েক মিনিটেরমধ্যে ধমনীটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই সাধারণ ভাষায়হার্ট অ্যাটাক (Myocardial Infarction) বলে।
হার্ট অ্যাটাকের কারণ
হার্ট মানব দেহের সমগ্রঅঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে। হার্টের নিজের বেঁচেথাকার জন্যও অক্সিজেন দরকার হয়। আর তা সম্ভব হয় প্রধান তিনটি করোনারী ধমনীরমাধ্যমে। ধমনীগুলো হার্টের উপরিভাগে এমনভাবে বিন্যস্ত থাকে যাতে হার্টেরসংকোচন প্রসারণের ফলে ধমনীর উপর কোন চাপ তৈরি না হয়। হার্টের উপরিভাগের এইধমনীগুলোর দেয়ালে চর্বি জমে ওঠে যার প্রধান চারটি কারণ হলো- ১. ধূমপান ২.ডায়াবেটিস ৩. হাই প্রেসার ৪. হাই কোলেস্টেরল মাত্রা। চিকিৎসা শাস্ত্রেএদেরকে বলে Major Risk Factors ।
হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ কি কি?
* বুকে এবং কখনোকখনো পেটের উপরিভাগে এবং পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভব। ব্যথার ধরণ এমন যে, মনেহয় বিশাল এক বোঝা বুকের উপর চেপে বুকের উপরের দিকে, গলার দিকে, কখনো কখনোনীচের চোয়ালের দিকে এবং বাম বাহুর দিকে, আবার কখনো উভয় বাহুর দিকে সঞ্চারণকরে। * প্রচুর ঘামের উদ্রেক হয়, বমি বা বমির ভাব হয় এবং আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় রোগী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। * কোন কোন ক্ষেত্রে হার্টের গতি কমে গিয়ে অথবা হৃদপিন্ডের তাল এলোমেলো হয়ে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। * হার্টের বিশাল অংশ আক্রান্ত হলে পাম্পিং ক্ষমতা মারাত্মক পরিমাণে কমে গিয়েরক্তচাপ অত্যন্ত নিম্নস্তরে নেমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগী বসে থাকতেবা দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধে বোধ করতে থাকে, এমনকি শুয়ে থাকতেও অস্বস্তি বোধকরে। * হঠাৎ ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্টে ভুগতে পারে। * ডায়াবেটিকরোগী, বৃদ্ধ বয়স, কিডনী রোগী ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপসর্গ ভিন্ন মাত্রায় এবং কমতীব্রতায় দেখা দিতে পারে। এমনকি ছোট খাটো হার্ট অ্যাটাক নিঃশব্দে ঘটে যেতেপারে।
পেটের উপরিভাগে ব্যথায় গ্যাস ভেবে অনেকে নিজে নিজে চিকিৎসা করে থাকেন।এই ধরণের ভুল ধারণার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে যায় এবং হার্টেরপ্রভূত ক্ষতিসাধন হয়।
হার্ট অ্যাটাকে যত মৃত্যু হয় তার প্রায় অর্ধেক হয় বাড়িতে, অফিসে বা পথেঅর্থাৎ হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বে। হাসপাতাল-পূর্ব মৃত্যুর অধিকাংশ কারণইহলো কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট অর্থাৎ হার্টের স্বাভাবিক ছন্দপতন হয়ে পাম্পিংক্ষমতার সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটে। শরীরের অন্য কোন অঙ্গের ক্ষেত্রে সাধারণত: এতদ্রুত বিপর্যয় ঘটে না। হার্ট অ্যাটাকের ধরণ, তীব্রতা এবং আকস্মিকতা এমনইযে, ঘটনার ঘনঘটায় রোগী হতবিহবল, হতভম্ব, বিপর্যস্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণেকিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।
রোগীর করণীয় কি?
* বুকে যে কোন ব্যথাই হার্টেরঅসুখের ব্যথা নয়। তবে ব্যথা যে হার্ট থেকে হচ্ছে না এটা নিশ্চিত হওয়াজরুরি। আর এটা নিশ্চিত করতে পারেন একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (কার্ডিওলজিস্ট)। * যদি বয়স ত্রিশোর্ধ হয়, বুকে হঠাৎ ব্যথা শুরু হলে রোগীর উচিৎ হবে সময়ক্ষেপননা করে সরাসরি কোন কার্ডিয়াক হাসপাতালের অথবা কাছাকাছি কোন বিশেষায়িতহাসপাতালের জরুরি বিভাগের শরণাপন্ন হওয়া। * যদি রোগীর চারটি প্রধানঝুঁকির যে কোন একটি থাকে, বয়স চল্লিশ বা তার বেশি হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ গুলেযায় এমন একটি ৩০০ মিলিগ্রাম এসপিরিন বড়ি চুষে বা আধা গ্লাস পানিতে গুলেখেয়ে ফেললে ভালো হয়। * রাতে হোক, দিনে হোক বুকে হঠাৎ ব্যথা শুরু হলেকালক্ষেপন না করে কার্ডিওলজিস্ট এর স্মরণাপন্ন হতে হবে। কার্ডিওলজিস্ট নাপাওয়া গেলে একজন অভিজ্ঞ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। * ‘গ্যাসের’ চিকিৎসা বা ভুল চিকিৎসা করে বিলম্ব করা ঠিক হবে না। হার্টের ক্ষতি হলে আসলে কার্যকরভাবে কিছু করার থাকে না।
রোগ নির্ণয় কেমন করে?
সঠিকভাবে রোগীর উপসর্গেরইতিহাস নিতে পারলে রোগ নির্ণয় অতি সহজ হয়ে যায়। জরুরি বিভাগে একটি ইসিজিকরলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বলে দেয়া সম্ভব যে, হার্টের কোন ধমনী বন্ধ হয়েহার্ট এ্যাটাক হয়েছে কি না। অ্যানজিওগ্রাম ছাড়াই একজন অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টএর পক্ষে রোগীর ইতিহাস এবং একটি ইসিজি থেকেই প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে বলেদেয়া যায় যে, হার্টের কোনো না কোন ধমনী হঠাৎ বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।তবে কিছু কিছু জটিল ক্ষেত্রে বেডসাইড ইকোকার্ডিওগ্রাম আমাদের সাহায্য করে।রক্তের পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক চিকিৎসা বিলম্বকরা যায় না। মনে রাখতে হবে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎপ্রতিটি মিনিটে মাংসপেশী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিলম্বিত ল্যাব রিপোর্টের জন্যঅপেক্ষা করা আত্মহত্যার সামিল।
প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি : হার্ট অ্যাটাকের আধুনিক চিকিৎসা হার্টেরমাংসপেশী অত্যন্ত অক্সিজেন-নির্ভর ও স্পর্শকাতর। ধমনী বন্ধ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে প্রতি মিনিটে মাংসপেশীর আয়ু কমতে শুরু করে। বন্ধ ধমনী দ্রুত খুলে নাদিলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে মাংসপেশীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে। কাজেই যততাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ ধমনী খুলে দিতে হবে। কেবলমাত্র জরুরি অ্যানজিওপ্লাস্টি (প্রাইমারি)-ই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনীকে নির্ভরযোগ্যভাবে, নিশ্চিতভাবেখুলে দিয়ে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সক্ষম।
জরুরী বিভাগে রোগ নির্ণয়ের সাথে সাথে রোগীকে ক্যাথ্ল্যাবে নিয়ে অতিদ্রুতবন্ধ হয়ে থাকা ধমনী খুলে দিতে হবে নব্বই মিনিটের মধ্যে। আধুনিক কার্ডিয়াকহাসপাতালে এই জন্য চব্বিশ ঘণ্টা ক্যাথ্ল্যাব চালু রাখা হয় এবং ক্যাথ্ল্যাবটিমকে সদাসতর্ক প্রস্তুত থাকতে হয় যাতে কোনভাবে একটি মিনিটও নষ্ট না হয়। শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে প্রাইমারী অ্যান্জিওপ্লাস্টি সফল হয়। সাফল্যেরহার নির্ভর করে উপসর্গ শুরু হবার পর কত তাড়াতাড়ি রোগী জরুরি বিভাগে এলেন, ঝুকি কত কমানো গেলো, প্রধান অপারেটর যিনি অ্যান্জিওপ্লাস্টি করবেন তাঁরঅভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি তাঁকে সহায়তা করবেন যে টিম তার সমন্বিত দক্ষতা।
২০০৪ সালে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হবার পর নিয়মিতপ্রাইমারী অ্যানজিওপ্লাস্টি করে আসছে। দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে আমরা যেঅভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানের। ল্যাবএইড কার্ডিয়াকহাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা ক্যাথ্ল্যাব টিম প্রস্তুত থাকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশেসরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় মিলিয়ে ল্যাবএইড সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাইমারিঅ্যানজিওপ্লাস্টি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
পদ্ধতি
প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি করতে রোগীকেকোনরূপ অজ্ঞান করার দরকার হয় না। একটি সাধারণ অ্যানজিওগ্রামের মতই স্থানীয়ব্যথানাশক দিয়ে সামান্য একটি ছিদ্রপথে ধমনিতে প্রবেশ করে রক্তনালী খুলেপ্রয়োজনীয় রিং পরিয়ে কিছু বিশেষ ওষুধ প্রয়োগ করে শেষ করা হয়। রক্তনালীখোলার সাথে সাথে রোগীর বুকের ব্যথা কমে যায়। নাড়ীর গতি, রক্তচাপ স্বাভাবিকহতে শুরু করে। একদিন সিসিইউসহ মোট ৩ দিন হাসপাতালে রেখে বাড়িতে পাঠানো হয়।
চিকিৎসা ব্যয়
প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি একটিউন্নত জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা। মনে রাখা প্রয়োজন যে, হার্ট অ্যাটাকেরপ্রাথমিক চিকিৎসা সনাতনী পদ্ধিতে (শুধুমাত্র ওষুধ প্রয়োগ করে) করার ২/১ দিনপর যে অ্যানজিওগ্রাম ও অ্যানজিওপ্লাস্টি করা হয় তাতে একই খরচ পড়ে। যাঁরামনে করেন যে, দেশে প্রাথমিক চিকিৎসা সনাতনী পদ্ধতিতে করে উন্নত চিকিৎসাবিদেশে করাবেন তাঁরা অত্যন্ত ভুল একটি ধারণা পোষণ করেন। কথায় আছে, সময়ের একফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। প্রাইমারি অ্যানজিওপ্লাস্টি যে মৃত্যুহার, মৃত্যুঝুকি এবং হার্টফেইল্যুর হ্রাস করে তা পরবর্তী সময়ে করাঅ্যানজিওপ্লাস্টি করতে অক্ষম।
সূত্র - poriborton.com

