‘আমার বাচ্চা খেতে চায় না’—প্রায় শতভাগ মা এ অভিযোগ করেন। আবার খাওয়ার সময় শিশুটি
নানা দুষ্টুমি করে, খাবার সহজে মুখে নিতে চায় না, একটু খেয়েই ক্ষান্ত দেয় ইত্যাদি সমস্যাও দেখা
দেয়। এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে মা-বাবারা টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের আশ্রয় নেন।
টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, কার্টুন অথবা কম্পিউটার মনিটরের দিকে শিশুকে তাকিয়ে থাকতে দিয়ে
সবটুকু খাবার কোনোমতে তার মুখগহ্বরে ঢেলে দেন মা-বাবারা। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আশ্বস্ত হন
এই ভেবে, ‘যাক বাবা, এবেলা সবটুকু খাওয়াতে পেরেছি!’
প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুকে এভাবে ‘খাদ্যবস্তু’ গলাধঃকরণের মাধ্যমে
তার প্রকৃত পুষ্টি নিশ্চিত করা যায় না এবং শিশুটির সুস্থ-স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে না। এ
জন্য বিশেষজ্ঞরা শিশুকে খাওয়ানোর কৌশল হিসেবে টেলিভিশন বা কম্পিউটারের ব্যবহারকে
নিরু সাহিত করেছেন।
কী হয়এভাবে খাওয়ালে
টেলিভিশন বা কম্পিউটারের দিকে শিশুকে তাকিয়ে থাকতে দিয়ে, অনুষ্ঠান দেখিয়ে তাকে খাওয়ালে শিশুর
খাদ্য গ্রহণের মধ্যে একটি শর্তাধীন অবস্থা তৈরি হয়। এ কারণে একদিকে প্রতি বেলা খাবারের
সময় তার টেলিভিশন বা কম্পিউটারে প্রয়োজন হয়, আরেক দিকে এগুলো দেখার সময় তার খাওয়ার
চাহিদা তৈরি হয়। মা-বাবারা বলবেন, ভালোই তো, বাচ্চাটি বেশি বেশি খাবে। কিন্তু এখানেও বাদ
সাধছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, এই শর্তাধীন অবস্থার সাহায্যে খাওয়ানোর ঝুঁকি অনেক।
প্রথমত, এর কারণে টেলিভিশন বা কম্পিউটারের প্রতি শিশুর নির্ভরশীলতা ও আসক্তি বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, টেলিভিশন বা কম্পিউটারের দিকে মনোযোগ থাকায় সে খাবারের স্বাদ আস্বাদন করতে
পারে না, কেবল গিলে খায়। তাই তার সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে না। এ ছাড়া খাবার ঠিকমতো চিবিয়ে
না খাওয়ায় হজমে সমস্যা হয়। সঠিক পুষ্টিমান নিশ্চিত হয় না। কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা সমস্যা দেখা
দেয়। কখনো উঠতি বয়সের শিশু-কিশোরেরা টেলিভিশন দেখতে দেখতে অথবা কম্পিউটারের মনিটরের
সামনে বসে ভাজাপোড়া ও স্ন্যাকস খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, যার পরিণতি অল্প বয়সে মুটিয়ে
যাওয়া এবং কিশোর বয়সে ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়া। কেবল টেলিভিশন বা
কম্পিউটার দেখা নয়, বিশেষজ্ঞরা বলেন, বই পড়তে পড়তে খাবার গ্রহণ করাও ঠিক নয়। এতেও
একই ধরনের সমস্যা হতে পারে।
টেলিভিশন বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত আসক্তি শিশুর খ্যাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার পাশাপাশি তার
মধ্যে অতিচঞ্চলতা ও অমনোযোগিতার মতো মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
তাহলে কী করবেন
l ধৈর্য ধরুন, সময় নিয়ে সন্তানকে খাওয়ান, তাড়াহুড়ো করবেন না। আপনার সময় কম থাকলে অন্য
কাউকে দায়িত্ব দিন।
l সব সময় একই ব্যক্তি সন্তানকে খাওয়াবেন না। মা-বাবা দুজনে দায়িত্ব ভাগ করে নিন। একেক
বেলা বা দিন একেকজন খাওয়ান। ‘আমার বাচ্চা আমার হাতে ছাড়া খায়ই না’ বলে আত্মতৃপ্তি বোধ
না করে বরং শিশুটির স্বাধীন খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলুন। তাকে নিজ হাতে খেতে উ সাহ দিন।
l শিশু একটু বড় হলে একসঙ্গে বসে খান।
l শিশুর খাদ্যতালিকা সুষম করুন। কেবল তার পছন্দসই বস্তু নয়, বরং প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান নিশ্চিত
হয়—এমন বস্তু খাদ্যতালিকায় রাখুন।
l খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের সময় শিশুকে খানিকটা অংশগ্রহণের সুযোগ দিন। এতে করে খাবারের
প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হবে।
l শিশুর খিদে লেগেছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে তাকে খাবার দিন। জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন
না।
l অনেক সময় কিছু মানসিক সমস্যার কারণে শিশুর খাদ্যাভ্যাসে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে
বিশেষজ্ঞ চিকি সকের পরামর্শ নিন।
সূত্র - প্রথম আলো

