‘আফা, আইজ আমার টিকা দেওনের দিন। কিন্তু সবতে কইল, আইজ নাকি টিকা দেওন অইবোনা।’
হাতে ধরা রিপোর্টটা থেকে চোখ সরে যায় দরজার দিকে কনসালট্যান্ট ডাক্তার মিসেস
তাহমিনার। অবাক হয়ে দেখছে। ফর্সা ও হাড় লিকলিকে শরীরের শিশু কন্যা নিজের গর্ভে বহন
করছে আরেক শিশু। শিশু কন্যার বয়স হবে বড়জোর চৌদ্দ কি পনের।
অপরিণত বয়সে বিয়ে, সন্তানধারণ, লালন-পালন ও শিশু বয়সে সংসারের দায়িত্ব নেয়া আমাদের
দেশের হাজারও অপরিণত বয়সের মেয়ের অভিন্ন পরিণতি। এতে একদিকে যেমন মায়ের
স্বাস্থ্যহানী ঘটে, তেমন অপরিণত বয়সে মায়ের গর্ভ থেকে যে সন্তান জন্ম নেয় সেও হয়
শারীরিক ও মানসিকভাবে রুগ্ন।
মায়েদেরকে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় গর্ভকালীন সময়। তাকে যেমন হতে হয় স্বাস্থ্য সম্পর্কে
সচেতন, ঠিক তেমনি তার প্রতি পরিবারের অন্য সদস্যদের যতœশীল হতে হয়। শিশুর শারীরিক ও
মানসিক পরিপূর্ণ বিকাশের পূর্বশর্ত হলো মায়ের সুস্থতা সুনিশ্চিতকরণ। সুস্থ ও সুন্দর শিশু
জন্মদানের লক্ষ্যে স্বামী, শাশুড়ি, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে গর্ভবতী
মায়ের এবং গর্ভস্থ সন্তান উভয়ের পরিচর্যা করা একান্ত অপরিহার্য। গর্ভকালীন সময়টাতে
মাকে থাকতে হয় সাবধানে, নানা নিয়ম-কানুনের ভেতরে।
১৯৭০-এর দশকে মা হওয়া নারীরা গর্ভকালে পুরোপুরি তাদের মায়েদের পরামর্শের উপর নির্ভর
করেছেন। তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের পরামর্শের উপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। ১৯৮০-
এর দশকেও একইভাবে পরামর্শ অনুসরণ করা হতো। তবে ২০০০-এ মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে
দেখা গেছে, তারা গর্ভকালে মায়ের পরামর্শের পাশাপাশি বই, ম্যাগাজিন, ধাত্রী, চিকি সক বা
ইন্টারনেটের মতো অন্যান্য উ স থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন।
ধারণা করা হয়, তাদের মায়েরা মা হওয়ার আগে ও পরের বিষয়গুলো সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল
জানেন। তারা বলেন, গর্ভবতী মায়েরা কোন সমস্যা অনুভব করলে তাদের উচিত নিজের মায়ের
পরামশের পাশাপাশি অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া। আধুনিককালে পরিবারের চেয়ে বিভিন্ন
ক্লিনিক ও চিকি সকদের পরামর্শই মেনে চলেন গর্ভবতীরা। পুরনো ধ্যান-ধারণা কমে এসেছে।
গর্ভবতী মায়েদের জন্য এমনিতে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। গর্ভ সঞ্চারের পর দুইভাবে যত্ন
নিতে হয়। প্রথমতঃ গর্ভবতীর স্বাস্থ্য ভালো রাখার ব্যবস্থা, দ্বিতীয়তঃ গর্ভস্থ সন্তানের
স্বাস্থ্য রক্ষা। গর্ভবতীর খাবার এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকে প্রথম থেকেই
গুরুত্ব দিতে হয়।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাসে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। গত ৪০
বছর ধরে শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে
শিশুর মৃত্যু হার কমেছে ৭৫ শতাংশ, মাতৃ মৃত্যু কমেছে প্রায় একই হারে। ২০৩৫ সালে মাতৃমৃত্যু
হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
শহর এলাকায় মৃত্যুর হার কমলেও এখনও গ্রাম-গঞ্জে অপসংস্কৃতির কারণে অনেক মৃত্যু হয়ে
থাকে। তাই গর্ভবতী মাকে নিজের যতœ সম্পর্কে জানতে হবে।
গর্ভাবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হলে চিকি সকের পরামর্শ অনুযায়ী চেকআপে থাকতে হবে।
গর্ভাবস্থায় কিছু স্বাভাবিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-কোনো কোনোখাবারের প্রতি
অরুচি, বমি বমি ভাব, বদহজম, বুকজ্বালা করা, কোমর ব্যথা ইত্যাদি। তাই যা খেতে ভাল লাগবে
তাই খাবে। হালকা সহজপাচ্য অথচ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। শাক, ফলমূল, ছোট মাছ, দুধ,
ডিম, মাখন অর্থা ভিটামিন ডি ও ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে নানা উপসর্গের উপশম হবে।
প্রাপ্ত বয়স্ক একজন নারীর দৈনিক দুই হাজার ১৬০ কিলোক্যালরি খাদ্যের প্রয়োজন। আর
একজন গর্ভবর্তী নারীর প্রয়োজন প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ খাদ্যের। ডিম, কাঁচা কলা, কচুশাক,
লাল শাক ও অন্যান্য সবুজ শাক খেতে হবে। শর্করা জাতীয় খাবার অধিক খেলে শরীরে ওজন
বেড়ে যায়। তাই আঁশযুক্ত শর্করা খাবার যেমন ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত, গমের রুটি খাওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবার গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করা যায়। এ সময় প্রচুর
পানি পান করতে হয়। দিনে অন্তত ৭ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত।
গর্ভবর্তী মা এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য আয়োডিন অতি প্রয়োজনীয় ও একটি পুষ্টি উপাদান।
গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত রোধ ও মৃত শিশুর জন্ম রোধ করার জন্য এবং নবজাতকের
জন্ম স্বাভাবিক হওয়ার জন্য আয়োডিনের অবদান অনস্বীকার্য। তাই শিশু ও গর্ভবতী মায়ের
প্রতিদিনের খাদ্যে আয়োডিন থাকা বাঞ্ছনীয়।
আয়োডিনের ঘাটতিতে গর্ভবতী মহিলা এবং শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গর্ভবতী মহিলাদের
ক্ষেত্রে আয়োডিনের অভাব ভীষণ রকম ঝুঁকিপূর্ণ। শরীরে আয়োডিনের অভাবে গর্ভবতী
মায়ের গর্ভপাত এবং মৃত কিংবা বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসবের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া গর্ভবতী
মায়ের দেহে আয়োডিনের অভাব হলে তার গর্ভের শিশুও গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
মস্তিষ্কের সুষ্ঠু গঠন ও বৃদ্ধির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য।
ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই প্রত্যেক গর্ভবতী
মাকে ডায়াবেটিস আছে কিনা পরীক্ষা করা দরকার। ডায়াবেটিস যদি গর্ভাবস্থায় প্রথম হয় বা
প্রথম দেখা দেয় তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলে। ডাক্তারের চিকি সাধীন থেকে ডায়াবেটিস
নিয়ন্ত্রণে রাখলে মা এবং শিশু উভয়েই সুস্থ থাকবে। গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ প্রসূতির
মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করে। তাই গর্ভকালীন রক্তচাপ নিয়মিত মনিটরিং করতে হয়।
প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রই সর্বোত্তম স্থান। গ্রামের নারীদের সাধারণত বাড়িতে প্রসব
করানো হয়। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে অবশ্যই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাই-এর ব্যবস্থা করতে হবে।
গর্ভবতী মায়েদের মন সব সময় ভালো থাকলে গর্ভস্থ শিশুর মানসিক বিকাশ সুষ্ঠু হয়। এ সময়
পরিবারের সবাইকে গর্ভবতী মাকে মানসিক চাপ থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করা উচিত। এ সময়
স্বামীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রীর সাথে মধুর সম্পর্ক রেখে যথাযথ সহযোগিতা করা তার
মূল কাজ। প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে জানতে হবে এবং মানতে হবে একজন সুস্থ মা-ই
জন্ম দিতে পারে সুস্থ একটি শিশুর।
নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত
জাতি দেব।’ তাই কোন একটি মেয়েকেও আর অপরিণত বয়সে এবং শিক্ষিত হয়ে ওঠার আগে
কোনভাবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে তার জীবনকে দুর্বিষহ করে না তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সূত্র - নতুন বার্তা ডট কম

