হট ইয়োগা’ বা উষ্ণ যোগব্যায়াম শরীরচর্চার জগতে অনেক দিন ধরেই আলোড়ন তুলছে। এটা শুধু রোমাঞ্চকরই নয়, খুব কার্যকরও বটে। উষ্ণ যোগব্যায়ামের পরস্পর সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ধারার সংমিশ্রণে এক নতুন ধারার শরীরচর্চার পদ্ধতি অনুসরণ করছেন যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত যোগব্যায়াম বিশারদ মিশেলে পারনেত্তা। তিনি এ ধারার নাম দিয়েছেন ‘ফিয়ার্স গ্রেস ইয়োগা’ বা ‘ক্ষ্যাপা শৈলীর যোগব্যায়াম’। স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চায় এ পদ্ধতির বিভিন্ন দিক নিয়ে দেশটির নারী সাময়িকী ‘ফিমেলফার্স্ট’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন পারনেত্তা।
উষ্ণ যোগব্যায়াম কী?
উষ্ণ যোগব্যায়াম বলে যোগব্যায়ামের আলাদা কোনো তত্ত্ব বা কলাকৌশল নেই। যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি তাপমাত্রার কোনো ব্যায়ামাগার বা ঘরে কোনো ধরনের যোগব্যায়াম করা হয়, তখনই একে উষ্ণ যোগব্যায়াম বলা যেতে পারে। ভারতীয় যোগব্যায়াম বিশারদ বিক্রম চৌধুরী গত শতকের সত্তরের দশকে বেশি তাপমাত্রায় যোগ অনুশীলনের এ ধারাকে জনপ্রিয় করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য যোগ-শিক্ষকেরাও বেশি তাপমাত্রায় ‘বিক্রম যোগ’, ‘শক্তি যোগ’, ‘অষ্টাঙ্গ বিন্যাস যোগ’সহ অন্যান্য ধারার যোগের অনুশীলন চালু করেন।যোগব্যায়ামের একটি বিশেষ ভঙ্গিমা
ক্ষ্যাপা শৈলীর যোগব্যায়াম
প্রবেশিকা থেকে শুরু করে অগ্রবর্তী স্তর পর্যন্ত অনুশীলনকারীদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে পরস্পর সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ক্লাসের সমন্বয়ে মিশেলে পারনেত্তা তাঁর ‘ক্ষ্যাপা শৈলীর যোগব্যায়াম’-এর নকশা করেছেন। এই পাঁচটি ক্লাসে অনেক ভিন্ন ভিন্ন আসনের চর্চা করা হলেও এটা নিরাপদ এবং ধীরস্থিরভাবে অগ্রগতি নিশ্চিত করে। কেননা অনুশীলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু নির্দিষ্ট আসনই বারবার ঘুরেফিরে আসে। ধ্যান, মানসিক চাপ কমানোর অনুশীলন ও অবকাশের বিভিন্ন আসনের সঙ্গে অনুপ্রেরণাসঞ্চারী সংগীতকে কাজে লাগানো হয় এই পদ্ধতিতে।
এ প্রসঙ্গে পারনেত্তা বলেন, সংগীতে যেমন চমক জাগানিয়া নতুন ধারাগুলো ঐতিহ্যবাহী ও ধ্রুপদি ধারার সঙ্গে কবিতা, কথকতা ও যন্ত্রানুষঙ্গের মিশেলে নিত্যনতুন পরীক্ষানিরীক্ষা চলে, ঠিক তেমনি যোগব্যায়ামের ক্ষেত্রেও ধ্রুপদি ধারার সঙ্গে নিরীক্ষামূলক ধারার সংমিশ্রণ ঘটছে আজকাল। এটা ঐতিহ্যবাহী ধারাকে অস্বীকার করা নয় বরং এসব নিরীক্ষা ঐতিহ্যের ঔরসেই জন্মানো। তবে, যোগব্যায়ামের বিভিন্ন ধারায় অভিজ্ঞ একজন যোগ্য শিক্ষকই কেবল এই নিরীক্ষা করতে পারেন।
উষ্ণ যোগব্যায়ামের উপকারিতাউষ্ণ যোগব্যায়ামের উপযোগী একটি কক্ষ
উষ্ণ ঘরে যোগব্যায়ামের সময় শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি এবং সংযোগস্থলগুলো সহনীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় থাকে বলে সেগুলো সর্বাধিক প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই এতে আহত হওয়ার আশঙ্কা কম। এ সময় বিভিন্ন অঙ্গ অনেক বেশি প্রসারিত হয় বলে শরীরে বেশি মাত্রায় রক্ত চলাচল এবং অক্সিজেন সঞ্চালিত হয়। এ অবস্থায় বিভিন্ন আসনের চর্চাও বেশ সহজ ও আরামদায়ক হয়।
এমন পরিবেশে ব্যায়াম চর্চায় বেশি মাত্রায় ঘাম হয়, যা শরীর থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বিষাক্ত রাসায়নিক বের করে দিতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রেই বেশি তাপমাত্রা মানুষকে মনোজগতে একটা আবেগাক্রান্ত আবহে নিয়ে যেতে পারে। এর ফলে এ সময়ের ধ্যানের আসনগুলোর মধ্য দিয়ে হয়তো সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি মাত্রায় ভিন্ন মনোজাগতিক আবহে পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারেন যোগব্যায়াম চর্চাকারীরা।
উষ্ণ যোগব্যায়ামের পরিবেশ
ব্যায়ামাগার বা নিজের বাড়িতেই বিশেষ পরিবেশ তৈরি করে উষ্ণ যোগব্যায়ামের চর্চা করা যেতে পারে। যে ঘরে এই চর্চা করা হবে, সেখানকার তাপমাত্রা ৯২ থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে। আর এ অবস্থায় লক্ষ রাখতে হবে যেন ঘরের আর্দ্রতা মোটামুটি ৪০ শতাংশের বেশি না হয়।
যোগব্যায়ামের একটি বিশেষ ভঙ্গিমানারীরা লেগিংস বা শর্টস ও টপস এবং পুরুষরা শর্টস ও টি-শার্ট পরে উষ্ণ যোগব্যায়াম করতে পারেন। তবে, নিজের বাড়ি হলে বা প্রাইভেসি থাকলে ইচ্ছেমতো হালকা পোশাকও পরা যেতে পারে। আর অবশ্যই লাগোয়া গোসলখানা এবং পর্যাপ্ত পানি পানের ব্যবস্থা রাখতে হবে কাছাকাছি। মেঝেতে ম্যাট বিছিয়ে নিতে হবে এবং প্রত্যেক অনুশীলনকারীর সঙ্গে তোয়ালে রাখতে হবে।
অনুশীলনকারীর খাদ্য-পানীয়
উষ্ণ যোগব্যায়ামকারীর খাদ্য-পানীয় সম্পর্কে মিশেলে পারনেত্তার পরামর্শ আয়ুর্বেদিক পদ্ধতি মেনে চলা। তিনি বলেন, ‘আমাদের শারীরিক গঠন সাধারণত প্রধান তিনটি ধরনে বিভক্ত। আমরা এটা না জানায় অনেক সময়ই ভুল ধরনের খাদ্য-পানীয়তে অভ্যস্ত হয়ে যাই।’ অনলাইনে ‘ডোশা-প্রশ্নোত্তরের’ মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী আপনার দেহগঠন কোন ধরনের।
বিশেষত উষ্ণ যোগব্যায়ামের অনুশীলন শেষে চিনি বা মিষ্টি জাতীয় পানীয়, ফ্রুকটোজ এবং ফলের রস বা জুস পান থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যায়ামের পর বিশ্রাম নিয়ে ভালোমতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান। চিনি ও কার্বোহাইড্রেট কম খান। বেশি করে শাকসবজি খান। নারকেল তেল, ঘি ও জলপাইয়ে ঠান্ডা তেলও খেতে পারেন।
সূত্র - প্রথম আলো

