-
ওষুধের বাজারে চলছে চরম নৈরাজ্য। ওষুধ প্রশাসনের পরীক্ষাগারের স্বল্পতা ও লোকবলের অভাবকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সমানে বাজারজাত করে চলেছে পরীক্ষাহীন, মানহীন, মেয়াদহীন নানা ওষুধ। সরকারি হিসাবমতে, দেশে অনুমোদিত জেনেরিক ওষুধের (অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক) সংখ্যা এক হাজার ২০০। কিন্তু বাজারে ব্র্যান্ড ওষুধ আছে ২৫ হাজার ৬৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিবছর পরীক্ষাগারে নিয়মিত পরীক্ষা হয় সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার ওষুধ। বাকি ২২ হাজার ওষুধের মান সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই ওষুধ প্রশসনের। এ অবস্থায় অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধের নামে ফার্মেসি থেকে যেসব ওষুধ কেনা হচ্ছে, সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির অভিযোগ, ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র পাচ্ছে অনেক ওষুধ কোম্পানি। ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি সূত্র জানায়, ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ৪৭৫টি নিম্নমানের ওষুধ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এ সময় বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, কিডনি ও ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইপরেক্যাস ইনজেকশন ও এর সঙ্গে মেশানো পানির এম্পুলেও ভেজাল। এসব ওষুধ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। নকল ট্যাবলেটের মধ্যে রাসায়নিক কোনো উপাদান নেই। শুধু ময়দা দিয়ে তৈরি হয় এসব ওষুধ। বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, সাড়ে ৭০০ রেজিস্টার্ড কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১০০টির ওষুধ মানোত্তীর্ণ। এর মধ্যে প্রচারণার আধিক্যে ৫০টি ওষুধ কোম্পানির ওষুধ বাজারে পরিচিত। বাকিগুলো কী ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে, তা তদারক করতে সরকার ও ওষুধ প্রশাসন ব্যর্থ। তারা বলে লোকবল নেই। আর বাজারে ভেজাল ওষুধ আসছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে। আবার শুধু বিএসটিআইর ছাড়পত্র নিয়েও বাজারে আসছে ওষুধ। তিন হাজার প্যাটার্নের লক্ষাধিক ওষুধ পরীক্ষার সামর্থ্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নেই। এ সুযোগে অসৎ ব্যবসায়ী ও নকলবাজরা বাজারে দাপটের সঙ্গে ওষুধকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করছে। ওষুধ প্রশাসন সূত্রমতে, বাংলাদেশে নিবন্ধীকৃত অ্যালোপ্যাথ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ২৬৫টি। সম্মিলিতভাবে তারা বাজারজাত করছে ২০ হাজার ৪৫৬টি ওষুধ। ৭৯টি হোমিওপ্যাথ প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ৭৫০টি ব্র্যান্ডের ওষুধ। ইউনানি ওষুধ কোম্পানি রয়েছে ২৬৭টি। তারা বাজারজাত করছে এক হাজার ৩২০টি ওষুধ। আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২০২টি। তারা তিন হাজার ১২০টি ওষুধ বাজারজাত করছে। এ ছাড়া হারবাল ওষুধ কোম্পানি রয়েছে ২৩টি। তাদের ব্র্যান্ডের রয়েছে শতাধিক ওষুধ। কিন্তু সরকারের ওষুধ পরীক্ষাগার আছে মাত্র দুটি। সেখানে এই বিপুল সংখ্যক ওষুধ নিয়মিত পরীক্ষা করার ক্ষমতা নেই। ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিটি ওষুধের গুণ ও মান পরীক্ষা করতে যে সময় লাগে, আর আমাদের যে জনবল ও পরীক্ষাগারের কাজের যে পদ্ধতি, তাতে দেশের বিদ্যমান ওষুধ পরীক্ষা করে দেখতে সময় লাগবে আড়াই বছর। ওষুধ ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দেশের বাজারে ৪০ শতাংশ ওষুধই নকল ও ভেজাল। আর ৮০ ভাগ ওষুধ নিরীক্ষা বা অনুমোদনহীন। বিষয়টিকে অতি বিপজ্জনক বলে মনে করছেন চিকিৎসা ও ওষুধ-বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তারা দায়ী করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত মাত্র ১২০০ মূল ওষুধের বিপরীতে ২৫ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরির অনুমোদন দেওয়ার সরকারি নীতিকে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই দুর্বলতার সুযোগে বাংলাদেশে বাড়ছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না ল্যাবরেটরি ও নিরীক্ষার সুবিধা। আবার অনেক কোম্পানি ওষুধের বোতল বা ছিপি, ক্যাপসুল বা ট্যাবলেটের পাতায় মেয়াদ উল্লেখ করে না। অসাধু ফার্মেসি মালিকরা এ সুযোগে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করে চলেছেন নিশ্চিন্তে। ২০০৮ সালের ২২ মের পর সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার নতুন কোনো গেজেটও প্রকাশ করেনি। আর ২০০৫ সালের ১৮ এপ্রিল প্রণীত ওষুধনীতির আলোকেই চলছে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। ফলে ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিন মাস পর পর মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এর বাইরে থেকে যাওয়া বিপুল পরিমাণ ওষুধ নিয়ে কী ভাবছে সরকার, জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ইতোমধ্যে আমরা ৬৪টি ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেছি। আর বাংলাদেশের ওষুধ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারছে বলেই আমরা ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে তা রপ্তানি করতে পারছি।

