লালমনিরহাটের পাটগ্রামে অবৈধ যন্ত্র দিয়ে অবাধে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর খাদ। আর এ খাদে পড়ে প্রায়ই প্রাণহানি ঘটছে। পাশাপাশি পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪ জন শ্রমিক এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীতে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় খাদ। অল্প পানিতেও বাইরে থেকে দেখে তা বোঝা যায় না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৪ জুন বুড়িমারী এলাকার ধরলা নদীর খাদে পড়ে একসঙ্গে সালমান, সোহাগ ও ফয়সাল নামের তিন শিক্ষার্থী মারা যায়। ওই শিক্ষার্থীরা ভারতের দার্জিলিংয়ের হিমালয় বোর্ডিং স্কুলে লেখাপড়া করত। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানরত বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য তাঁরা চ্যাংরাবন্ধা হয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দরে এসেছিল। ঘটনার দিন ধরলা নদীর পাড়ের হাঁটু পানিতে নেমেছিল তারা। একপর্যায়ে গভীর খাদে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। এলাকাবাসী জানান, এভাবে গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
যন্ত্রের মাধ্যমে উত্তোলণ করা ছোট ও মাঝারি আকারের পাথর সরাসরি নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কিছুটা বড় আকারের পাথর ক্রাসিং মেশিনে ভেঙে বিক্রি করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে পাথর ভাঙার কাজ। এসব কাজে সহস্রাধিক শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে মারা যাচ্ছেন।
পাটগ্রামের পাথর ভাঙার মেশিনের মালিকদের কেউই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেননি বলে পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সাইফুল্লাহ তালুকদার নিশ্চিত করেছেন। চিকিৎসকেরা বলেন, বালুর সিলিকা অথবা সিলিকন থেকে সিলিকোসিস রোগের উৎপত্তি। ক্রাসিং মেশিনগুলোর ধুলা কিংবা পাথরের গুঁড়ার মধ্যে থাকা সিলিকন নাক-মুখ দিয়ে শরীরে ঢুকে ফুসফুসের ওপর প্রলেপ ফেলে। এতে আক্রান্ত রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। শরীর ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে। শ্বাসকষ্ট, কাশি, খাওয়ায় অরুচি, অলসতাসহ ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। স্থায়ীভাবে এ রোগ সারানোর কোনো চিকিৎসা নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত উপজেলার কমপক্ষে ১৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন। তাঁরা হলেন: উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ার রবিউল (৩০), একই এলাকার আমির হোসেন (২৫), সফর উদ্দিন (৪৫), আমির হোসেন-২ (৩২), নুর ইসলাম (৩৫), বামনদলের সবেদার (২২), তাঁর ভাই নুরুজ্জামান (২৬), নুর আমিন (৩০), তাঁর বাবা তফির হোসেন (৪৫), বানিয়ারডাঙ্গির আইনুল (৩৫), কামারের হাটের মজনু (৩৫), বামনদল এলাকার লিটন (৪০), ফরিদুল (৩০) ও কোনাকাটা (৪০)।
রবিউলের স্ত্রী শিউলী (২৫) বলেন, আগে তার স্বামী ক্ষেতখামারে কাজ করতেন। কিন্তু কাজ না থাকায় পড়ে বাধ্য হয়ে পাথর ভাঙার কাজ করতে যায়। আগে জানলে না খেয়ে থাকলেও তিনি স্বামীকে ওই কাজ করতে দিতেন না।
বুড়িমারীর বানিয়াপাড়া এলাকার সিলিকোসিসে আক্রান্ত শ্রমিক-সরদার আজানুর রহমান বলেন, তাঁর নেতৃত্বে একসময় ১০০ জন শ্রমিক পাথর ভাঙার কাজ করতেন। কিছুদিন কাজ করার পর শ্রমিকেরা অসুস্থ হতে শুরু করেন। তখন তিনিসহ অনেক শ্রমিক এ কাজ ছেড়ে দেন। দুই বছর ধরে তিনি অসুস্থ। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।
একই এলাকার শ্রমিক আজিজুল হক (৩৫) বলেন, তাঁর পুরো শরীর শুকিয়ে গেছে। অর্থের অভাবে তিনি চিকিৎসা নিতে পারছেন না। অসুস্থ হওয়ার পর পাথর ভাঙায় জড়িত ব্যবসায়ীরা তাঁদের কোনো খোঁজও রাখেন না।
পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই হাসপাতালে আসছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর হোসেন সরকার বলেন, তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ ব্যাপারে তিনি পদক্ষেপ নেবেন।
Source: The Daily Prothom Alo

