রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের কারণে দেশের অভ্যন্তরে যে চারটি ফল্ট রয়েছে তাতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে।
এতে যেকোনো সময় বড় ধরণের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া প্রায়শই মাঝারি বা মৃদু ভূমিকম্প বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে বুধবার সকাল ৭টা ৪১ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর উত্পত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪৯৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ভারত-মিয়ানমার সিমান্তে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৯ মাত্রা।
ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রাজধানী
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে চারটি ফল্ট রয়েছে এসব ফল্টে অতীতে যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে তা ৭ মাত্রার বেশি ছিল। ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে ৮. ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালে ভূমিকম্প হয়েছিল ৭ মাত্রার ওপরে। ১৭৬২ সালে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল সীতাকুন্ড-মিয়ানমার ফল্টে।
আসাম-সিলেট ফল্টে ভূমিকম্প হয়েছিল প্রায় ৪শ বছর আগে। অর্থাৎ এসব ফল্টে গড়ে একশ বছর পূর্বে ভূমিকম্প হয়েছিল। এখন বড় ধরণের ভূমিকম্পের জন্য যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা এসব ফল্টে সঞ্চিত আছে। তবে চারটি ফল্টের মধ্যে মধুপুর ফল্ট এখন খুবই সক্রিয়। আর মধুপুর ফল্ট রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় এ শহরটি এখন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।
তাদের মতে, ঢাকা মহানগরীর ৫৯০ বর্গমাইল এলাকায় মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার ভবন রয়েছে। এরমধ্যে প্রধান শহরেই ৩ লাখ ২৬ হাজার ভবন। এর মধ্যে প্রায় ৭২ হাজার ভবনকে ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাত্র ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভবনগুলো ধসে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ঢাকায় রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। স্বাভাবিকভাবেই যেখানে ঘনবসতি বেশি সেখানে ঝুঁকিও বেশি। অথচ রাজধানীবাসীদের মধ্যে ভূমিকম্পের সচেতনতা নেই বললেই চলে।
এছাড়া এ ব্যাপারে সরকারের প্রস্তুতিও তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। তাই এখনই যথার্থ পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে রাজধানীবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ১৫০ বছরে বাংলাদেশে ৭টি বড় আকারের ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে দুটির কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এর মধ্যে ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার কেন্দ্রস্থল ছিল সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। আর ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই একই মাত্রার ভূমিকম্পটি হয়, যার কেন্দ্রস্থল ছিল মানিকগঞ্জে। আরো কয়েকটি ভূমিকম্প বাংলাদেশের কেন্দ্র না হলেও রেখে গেছে ধ্বংসের স্বাক্ষর।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প, যার কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতের শিলং শহরে।
তবে সেসময় বহুতল ভবন না থাকায় তেমন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই সময় বহুতল ভবন না থাকলেও এখন রাজধানীসহ সারাদেশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আকতার জানান, বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা। সেই সঙ্গে ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
ভূমিকম্পের ক্ষয় ক্ষতি মোকাবেলা প্রসঙ্গে অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আকতার বলেন, “সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিং করার পাশাপাশি হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারি জরুরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভূমিকম্পের পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা করতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে জনসচেতনা বৃদ্ধিতে। আর এটা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “আশঙ্কা করা হচ্ছে, ঢাকা শহরে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৩০ ভাগ ভবন ভেঙে পড়তে পারে এবং মারা যেতে পারে প্রায় ৩ লাখ মানুষ। রাতের বেলায় ভূমিকম্প হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়বে। এ সত্যকে মাথায় রেখেই আমাদের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি যাতে কম হয় সে ব্যাপারে সচেতন হওয়া এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
content aggregation:healthPrior21
source:sangbad24
http://www.sangbad24.net/?p=45195

