ঠাকুরগাঁও : কুয়াশায় ঢাকা সড়ক ধরে স্কুলে যাচ্ছে কয়েকজন শিক্ষার্থী হনয়া দিগন্ত
প্রচণ্ড শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সারা দেশের জনজীবন। শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছেই। সেই সাথে কনকনে হিমেল হাওয়ায় নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শ্রমজীবী ও দিনমজুরি করে খেটে খাওয়া মানুষ। ঘন কুয়াশার কারণে কোথাও কোথাও ১১ দিন পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল। শীতের প্রকোপ ও শীতজনিত রোগে গতকাল পর্যন্ত আরো ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, গত এক সপ্তাহে হাড়কাঁপানো শীতে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার উত্তর নিলতী গ্রামের তহিরুননেছা (৬০) গত সোমবার রাতে প্রচণ্ড শীতে কোল্ড স্ট্রোক করে মারা যান। এ ছাড়া উপজেলার রোঙ্গাকাঠী গ্রামের শ্রীকান্ত মিস্ত্রী (৯০) এবং একই গ্রামের মহেন্দ্রনাথ (৮০) শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। গত তিন দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে ছিন্নমূল মানুষেরা শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শীতের কারণে দিনমজুরেরা শ্রম বিক্রি না করতে পেরে অর্ধাহারে অনাহারে দিনানিপাত করছেন। শীতজনিত রোগে হাসপাতালে শিশু ও বৃদ্ধ রোগী দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজাপুর (ঝালকাঠি) সংবাদদাতা জানান, রাজাপুরে হাড়কাঁপানো তীব্র শীতে গত তিন দিনে শতাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তিও হয়েছেন অনেকে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে উপজেলার বড়ইয়া গ্রামের আব্দুস ছোবহানের স্ত্রী জাহানুর বেগম (৬০) এবং উত্তর পালট গ্রামের মোকছেদ আলী খানের স্ত্রী হায়াতুনেচ্ছা (৬৫) মারা গেছেন। রাজাপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার আবুল খায়ের রাসেল জানানÑ ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানিসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিনে আউটডোর ও ইনডোরে শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ জন ভর্তি আছেন।
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মিঠামইন বড় হাওরে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত সোমবার নিজাম উদ্দীন (৬৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে। এদিকে অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের লাওরগ্রামের সুমন মিয়ার ১০ মাসের একটি শিশু ঠাণ্ডাজনিত রোগে মারা গেছে।
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে শুধু কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালেই মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। এদের মধ্যে ২০ জনই শিশু। শীত ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে সব চেয়ে বেশি আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধরা। কয়েক দিন থেকে সূর্যের দেখা না মেলায় হাড়কাঁপানো শীতে লোকজন কাবু হয়ে পড়ছেন। কাজে বেরুতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষ। ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা ও আলু েেতর ব্যাপক তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, কুড়িগ্রাম অঞ্চলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, ছিন্নমূল মানুষ কনকনে শীতে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাদের মাথার ওপর নেই ছাদ, পরনে নেই শীত নিবারণের গরম কাপড়। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। কয়েক দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও প্রশাসনের নামমাত্র কম্বল ছাড়া কোনো বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসেনি। এদিকে পার্বতীপুরের প্রত্যন্ত পল্লীতে প্রচণ্ড শীতে সকালে মাঠে কাজ করতে গিয়ে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি চণ্ডিপুর ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী গ্রামে। তার নাম হোসেন আলী (৬০)। উপজেলার পৌরসভাসহ ১০টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার ছিন্নমূল মানুষ শীতের প্রকোপে স্থবির হয়ে পড়েছেন। কাজকর্ম করতে না পারায় প্রায় ৫০ হাজার দিনমজুর অনাহারে দিনাতিপাত করছেন।
হবিগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, একাধারে তিন দিন ঘন কুয়াশার কারণে হবিগঞ্জের আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার ছিল কুয়াশাবৃষ্টি। প্রচণ্ড শীতে কাবু পুরো জেলাবাসী। তিন দিন পর বুধবার হবিগঞ্জের আকাশে সূর্যের দেখা মেলে। কনকনে শীতে জেলার বিভিন্ন স্থানে গরম কাপড় বিতরণ করেন বিত্তবানেরা। বানিয়াচঙ্গে ২০০ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারপরিজনের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন ফনিক্স। এ দিকে মঙ্গলবারে মধ্যরাতে শহরের ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: আবু জাহির।
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা জানান, টানা ১১ দিনের শৈত্যপ্রবাহ আর হিমেল হাওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের বেলা সূর্য উঁকি দিচ্ছে না। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরছে। এতে ঠাণ্ডার তীব্রতা আরো বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষজন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তারা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থেকে আত্মরার্থে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
শৈত্যপ্রবাহের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে শুধু ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ৫০০ রোগী ভর্তি হন। বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৭০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে আদিবাসী, ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষ কাজে যেতে পারছেন না। ফলে সন্তান ও পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। ঘন কুয়াশার কারণে দ্রুতগামী যাত্রীবাহী কোচ ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন যথাসময়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছতে পারছে না। এ দিকে টানা ১১ দিন থেকে আকাশে সূর্যের মুখ দেখা না যাওয়ায় ঠাকুরগাঁও জেলার এক হাজার ৫০০ হাসকিং মালিক বিপাকে পড়েছেন। তারা জানান, ঠাণ্ডায় শ্রমিকেরা নিয়মিত কাজে না আসায় এবং রোদ না থাকায় চাতালের ধান তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মূকেশচন্দ্র বিশ্বাস জানান, এ বছর সরকারিভাবে সাত হাজার কম্বলের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। চাহিদার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত সাড়ে ছয় হাজার কম্বল পাওয়া গেছে। এসব কম্বল দুই-তিন দিনের মধ্যে পাঁচ উপজেলায় বিতরণ করার কথা রয়েছে।
content aggregation:healthPrior21
source:dailynayadiganta
http://www.24livenewspaper.com/site/index.php?url=www.dailynayadiganta.com

