বাংলাদেশ জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১১-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো গত ১৭ এপ্রিল। গবেষক, জনস্বাস্থ্যকর্মী, উন্নয়নকর্মী, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের কাছে এই জরিপের তথ্য-উপাত্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নানা গবেষণা, পরিকল্পনা ও কর্মোদ্যোগে এর ব্যবহারও বিচিত্র। কারণ এই জরিপ থেকে প্রতি চার-পাঁচ বছর পরপর দেশের জনবিন্যাস, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং পরিবর্তনের গতিপথের ছবিটি পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ষষ্ঠবারের মতো পরিচালিত এই জরিপে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিকর্মীদের উৎসাহিত হওয়ার মতো বেশ কিছু ফল পাওয়া গেছে। গত ১৮ বছরের মধ্যে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার এবারই পাওয়া গেল সর্বোচ্চ। ১৯৯৩-৯৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ওঠানামা করেছে ৪৩ থেকে ৪৬ শতাংশের মধ্যে। অথচ এবার সেটি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে উঠে এসেছে ৬৪ শতাংশে। নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হারও ক্রমশ কমে শতাব্দীর উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দিকে এগিয়ে চলেছে। জন্মনিরোধকের ব্যবহার বেড়েছে, কমেছে প্রজনন হার। মা ও শিশুর যত্ন সম্পর্কিত সূচকগুলোতেও দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক বদলের ধারা। দেশে যে শিশুপুষ্টির উন্নতি হয়েছে, এই প্রতিবেদন থেকে সে সুখবরটিও জানা যাচ্ছে। এ জরিপ বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বয়স অনুপাতে যতটা ওজন থাকার কথা, তেমন ওজন আছে দেশের প্রায় ৭৪ শতাংশ শিশুর। অর্থাৎ প্রতি ১০টির মধ্যে সাতটিরও বেশি শিশুর ওজন বয়সের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এর সবই অত্যন্ত সুসংবাদ; বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ অর্জন।
তবু এতসব সুসংবাদের পরও তথ্যগুলোকে আরও তলিয়ে এবং বাস্তবতার নিরিখে মিলিয়ে দেখার অবকাশ আছে। কারণ এই একই প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে শোচনীয় আরও একটি তথ্য। জানা যাচ্ছে যে দেশের ৪১ শতাংশ শিশু বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে উঠছে না। বয়স অনুপাতে শিশুর যতটা বেড়ে ওঠার কথা, দেশের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি শিশু সেভাবে বড় হচ্ছে না। তারা দুঃখজনকভাবে থেকে যাচ্ছে খর্বকায় শিশুর দলে। জরিপটি বলছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের শিশুদের খর্বতার হার ৪৩ শতাংশ থেকে কমে ৪১ শতাংশ হয়েছে। মানে, খর্বতার হার কমেছে নামমাত্র দুই শতাংশ। কোথাও ৪০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি শিশু খর্বকায় থাকলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে সর্বোচ্চ অপুষ্ট জনগোষ্ঠী বলে বিবেচনা করে থাকে। বিষয়টি তাহলে দাঁড়াচ্ছে কোথায়? জরিপের এক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে অপুষ্টির হার কমেছে। কিন্তু আরেক তথ্য বলছে, অপুষ্টির হার এখনো যথেষ্ট তীব্র। সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, তথ্য দুটি স্ববিরোধী।
অপুষ্টিকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: একটি দীর্ঘমেয়াদি, অন্যটি স্বল্পমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টিকে চিহ্নিত করা অপেক্ষাকৃত সহজ। এ ধরনের অপুষ্টিতে শিশুর শরীর কৃশকায় বা হাড্ডিসার হয়ে পড়ে। অসুখ-বিসুখ বা অন্য কোনো কারণে অল্প সময়ের জন্য খাবারের ঘাটতি দেখা দিলে এ ধরনের অপুষ্টি তীব্র হয়ে ওঠে। তবে দ্রুত খাবার নিশ্চিত করা গেলে শিশু তার বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক গতিপথে আবার ফিরেও আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিশু খাদ্যঘাটতির মধ্যে বাস করলে তার শরীর অপুষ্টির সঙ্গে আপস করতে শুরু করে। প্রয়োজনীয় খাদ্যাভাব পূরণে ব্যর্থ হয়ে শরীর তার বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক ধারাটিকে শ্লথ করে দেয়। ফলে বয়স অনুপাতে যতটা হওয়ার কথা, শিশুটি তার চেয়ে অনেক কম উচ্চতা নিয়ে খর্বকায় হয়ে টিকে থাকে। এ শিশুদের উচ্চতা কম হওয়ায় খালি চোখে দেখে তাদের অপুষ্ট বলে মনে হয় না। তার খর্বতাকে অস্বাভাবিক বলে বুঝে ওঠার আগেই চিরতরে তার অপূরণীয় ক্ষতিটি ঘটে যায়।
কোন জনগোষ্ঠীতে কোন ধরনের অপুষ্টির পরিমাণ কেমন, সেটি চিহ্নিত করেই সে অনুযায়ী অপুষ্টি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে। যে দেশে অধিকাংশ শিশু দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভুগছে, সেখানকার পুষ্টি কার্যক্রমের কর্মকৌশল হবে স্বল্পমেয়াদি অপুষ্টিতে আক্রান্ত দেশের চেয়ে আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশের পুষ্টির অবস্থা পরিমাপ বা এ সংক্রান্ত নীতি ও কর্মকৌশল ঠিক করতে এই দুই সূচকের কোনোটিই ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাংলাদেশে ব্যবহূত হচ্ছে ‘বয়স অনুপাতে ওজন’-এর সূচকটি। এটি একটি মিশ্র সূচক। এই সূচকের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে পুষ্টি অবস্থার উন্নতি ঘটছে। মুশকিল হলো, একটি জনগোষ্ঠীর পুষ্টি অবস্থা কেমন, সেখানকার অপুষ্টি স্বল্পমেয়াদি না দীর্ঘমেয়াদি—এই সূচকটি দিয়ে তা স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
খর্বতা বা কৃশতা—দুই ধরনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়েই বয়স অনুপাতে শিশুর ওজন কমে যেতে পারে। মিশ্র সূচক ব্যবহার করলে এই দুই ধরনের অপুষ্টিকে আলাদা করে বুঝে ওঠা কঠিন। আমাদের দেশে মিশ্র সূচক ব্যবহূত হয় বলে পুষ্টি অবস্থা যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায় না। ফলে নীতিনির্ধারণ বা কার্যক্রম গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও সঠিক উপায় বের করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রথম লক্ষ্য পূরণের জন্য যেসব সূচক বেছে নেওয়া হয়েছিল, ‘বয়স অনুপাতে ওজন’ ছিল তার একটি। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সূচকের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে এই মিশ্র সূচকটি মেনে নিতে হয়। সেটির পাশাপাশি ‘বয়স অনুপাতে উচ্চতা’র সূচকটিও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশে শিশুদের খর্বতার সমস্যাটি আরও আগেই চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়া যেত।
চিত্রটি এখন বেশ জটিল। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার শুরুতে ১৯৯০ সালে বয়স অনুপাতে কম ওজনের শিশুর হার যখন ৭১ শতাংশ; শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির পরিমাণ তখন ছিল তার চেয়ে কম, ৬৮ শতাংশ। অথচ ২০১১ সালে বয়স অনুপাতে কম ওজনের শিশুর পরিমাণ যে হারে কমেছে, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্ট শিশুর পরিমাণ সেভাবে কমেনি। বয়স অনুপাতে কম ওজনের শিশুর হার যেখানে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে, অর্থাৎ ৩৬ শতাংশে; দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্ট শিশুর হার সেখানে কমেছে তার চেয়ে বেশ কম মাত্রায়, মাত্র ৪১ শতাংশ। বয়স অনুপাতে ওজনের হারের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির হার কমেছে বেশ ধীর গতিতে। আর ঠিক এটিই এখন বাংলাদেশের অপুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এদিকে জরুরিভিত্তিতে নজর না দিয়ে আর পার পাওয়ার উপায় নেই। দেশে এখন ‘স্বাস্থ্য জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতভিত্তিক কার্যক্রম’ শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রমের অধীনে জাতীয় পুষ্টিসেবার আওতায় ‘খর্বতা হ্রাসকরণ’ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে সুষ্ঠু পদক্ষেপ নিতে পারলে আগামী দেড়-দুই দশকে আমাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির সমস্যাটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। কারণ পুষ্টির অভাব যে খর্বতার জন্ম দেয়, জাতিকে তা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও নির্জীব করে আনে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব চলতে থাকে প্রজন্মান্তরে। জাতি তার বড় একটি অংশকে শারীরিক-মানসিকভাবে পেছনে ফেলে রেখে কখনোই সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।
আসফিয়া আজিম: পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যকর্মী।
asfia.azim@concern.net
Source: The Daily Prothom Alo

