বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, এসব ওষুধ সেবন করলে কিডনি, লিভারসহ নানা অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে। এদেশে ভেজাল, নকল, বিষাক্ত ওষুধ খেয়ে রোগী মরলে কোন বিচার হয় না। ১৯৯০ সালে বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে কয়েকশ শিশুর প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফের হাতে এ স্মরণকালের মর্মান্তিক ঘটনা ধরা পড়ে। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ। তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ প্রস্তুতকারী কোম্পানির মালিকের কোন সাজা হয়নি। শুধু ওই কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে। জেল হলে পরবর্তীতে জামিনে বের হয়ে যায় অপরাধীরা। নকল ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ বাজারজাত করে এক মাসের আয়ের কিছু অংশ ব্যয় হয়েছে ঐ মালিকের বলে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান। ২০০৭ সালেও বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে বেশকিছু শিশু মারা যায়। ওষুধ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ভেজাল, নকল বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাতকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর। মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলে ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাত বন্ধ হতো। বর্তমানে জেল-জরিমানায় নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদনকারীরা উত্সাহিত হয়। তারা এ জেল-জরিমানাকে ভয় পায় না বলে উক্ত কর্মকর্তা জানান। অপরদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের একশ্রেণীর কর্মকর্তা নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদনকারীদের কাছ থেকে পাচ্ছে নিয়মিত মাসোহারা। নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাত ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার এটি অন্যতম কারণ বলে এক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করেন।
গোপনসূত্রে সংবাদ পেয়ে র্যাব-১০-এর পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট গতকাল কেরানীগঞ্জ কুশিয়ারবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিটফোর্ডের পাইকারি ওষুধ বিক্রেতা রাসেল আহমেদের নকল ও বিষাক্ত ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। ঐ কারখানার মালিক রাসেলের পিতা হাজী আশরাফ আলী। মোবাইল কোর্ট রাসেল আহমেদকে আটক করে। কারখানা থেকে বিপুল সংখ্যক নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ এবং তৈরির উপকরণ ও যন্ত্রপাতি জব্দ করে। রাসেলকে ২ বছর কারাদণ্ড দেয় মোবাইল কোর্ট। কারখানা সীলগালা করে মোবাইল কোর্ট। বিশেষ ক্ষমতা আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করার নির্দেশ দেয়। ৪ তলা ভবনের তৃতীয় তলায় কারখানাটি দীর্ঘদিন নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ তৈরি করে আসছিল রাসেল। আটা, ময়দা ও কেমিক্যাল সংমিশ্রণে এ বিষাক্ত, ভেজাল ও নকল ওষুধ তৈরি করে আসছিল। ছয়টি নামি দামি কোম্পানির নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ তৈরি করে রাসেল মিটফোর্ড আমির মার্কেটে নিজ দোকানে পাইকারী বিক্রি করে আসছিল দীর্ঘদিন। শক্তি বর্ধক, ব্যথা নাশক ও নানা ধরনের এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল রাসেল তৈরি করতো বলে মোবাইল কোর্টকে জানায়।
কেমিস্ট্র এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতি সূত্রে জানা যায় যে, এর আগে রাসেলকে নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদন করে বাজারজাত করায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার দোকান সমিতির পক্ষ থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়। কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও এলাকার সন্ত্রাসী গ্রুপ ভয় দেখিয়ে রাসেলের দোকান চালু করা হয়। সে দ্রুত ছাড়া পেয়ে পুনরায় নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ প্রকাশ্যে পাইকারী বিক্রি করতে থাকে। এ সব ওষুধ রাজধানীসহ সারাদেশে ওষুধের খুচরা ব্যবসায়ীরা নিয়ে বিক্রি করে থাকে। রাসেলের কোটি কোটি টাকার আয়ের ভাগ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসীরা নিয়মিত পেয়ে থাকে। তার কঠোর শাস্তির দাবি জানায় উক্ত সমিতি।
রাসেল নিজে তৈরি করতো ওষুধ
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা: এলাকাবাসী জানিয়েছেন, দীর্ঘ দিন ধরে জিনজিরা ইউনিয়নের ছোট কুশিয়ারবাগ এলাকার বাসিন্দা হাজি আসরাফ আলীর ছেলে রাসেল আহমেদ তাদের বাড়িতে নকল ওষুধের কারখানা দিয়েছে। এসব নকল তৈরিকৃত ওষুধ রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় ওষুধ মার্কেটে পাইকারী বাজারজাত করে থাকে। মিটফোর্ড এলাকায় রাসেল আহমেদের একটি ওষুধের দোকান রয়েছে। সেখান থেকেও সে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ সাপ্লাই করে থাকে। এর আগেও কারখানার মালিক রাসেল আহমেদ নকল ওষুধ নিয়ে ধরা পড়ে ছিল। রাসেল আহমেদ দন্ডপ্রাপ্ত আসামি। সে পলাতক অবস্থায় আবারও নকল ওষুধের ব্যবসা শুরু করে। কিছু সাদাপোশাকের পুলিশ রাসেল আহমেদের কাছ থেকে নিয়মিত বখরা নিয়ে থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৪তলা বাড়ির ৩তলায় একটি কক্ষে নকল ওষুধ তৈরির কারখানা দিয়েছে রাসেল আহমেদ। কারখানার ভিতরে ওষুধ তৈরির মেশিন রয়েছে। মেশিনের নাম রাখা হয়েছে বল প্রেস মেশিন। মেশিনগুলো সে নিজেই আবিষ্কার করেন। ওষুধ তৈরির সবধরনের মেশিন রয়েছে তার কাছে। তার বাড়িতে বাহিরের লোক প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কারখানার ভিতরে শুধু রাসেল আহমেদ নিজেই ওষুধ তৈরি করতো।
র্যাব-১০ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা বলেন, অভিযান চালানোর সময় রাসেল আহমেদ পালানোর চেষ্টা করেছিল। সে আগেও নকল ওষুধ নিয়ে ধরা পড়েছিল। কেরানীগঞ্জ থেকে ওষুধ বানিয়ে মিটফোর্ড নিয়ে পাইকারী বাজারজাত করে থাকে। ওষুধ তৈরির সব ধরনের মেশিন তার বাসায় রয়েছে। কেরানীগঞ্জের র্যাব-১০ এর মেজর আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, নকল ওষুধ তৈরির কারখানাটি তিন মাস অনুসন্ধান চালিয়ে উদ্ধার করি। মিটফোর্ড এলাকায় গিয়েও রাসেল আহমেদকে পাওয়া যায়নি। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা ইউনিয়নের ছোট কুশিয়ারবাগ এলাকায় রাসেলের নিজ বাড়িতে কারখানা থাকার খোঁজ পেয়ে অভিযান চালানো হয়।

