শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে নবজাতকের মৃত্যু। জাতীয় অর্জন ভালো হলেও শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এখনো পিছিয়ে আছে। ধনী ও গরিব পরিবারের শিশুদের মধ্যে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আছে বৈষম্য।
গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ‘শিশুদের জীবনরক্ষায় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্তকরণ’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক ১৭৫টি দেশের সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে ২০-এ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন।
গত ২১ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ, ইউএসএআইডি, সেভ দ্য চিলড্রেন, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক প্রথম আলোকে বলেন, শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশ যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে করে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে, তা দূর করতে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
সরকার অঙ্গীকার পালনের উদ্দেশ্যে একটি বেঞ্চমার্ক তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাত দফা কর্মসূচি এবং কৌশলগত কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে। এতে শিশুমৃত্যুর বর্তমান চিত্র এবং ২০১৬ ও ২০২০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) ২০১১ প্রতিবেদনে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে আঞ্চলিক এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দরিদ্র পরিবারকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি হাতে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। সাত দফা কর্মসূচি এবং কৌশলগত কর্মপন্থায় এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার, অর্থাৎ প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১৯৯৩-৯৪ সালে ১৩৩ জন মারা যেত। ২০১১ সালে তা হয়েছে ৫৩। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৬০ শতাংশ। বিডিএইচএস ২০১১ অনুযায়ী, দেশে শিশুমৃত্যু রোধ এবং শিশুর বেঁচে থাকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে, ২০১৫ সালের আগেই জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ (শিশুমৃত্যু কমানো) অর্জনের পথেই আছে বাংলাদেশ।
বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দেশে মেয়েশিশুরা ছেলেশিশুদের চেয়ে বেশি মারা যেত। তবে সর্বশেষ বিডিএইচএসের প্রতিবেদন বলছে, এ ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে ছেলেশিশুদের চেয়ে ১২ শতাংশ কম মেয়েশিশু মারা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেনের সেভিং নিউবর্ন লাইভস কর্মসূচির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত এক দশকে নবজাতকের মৃত্যুহার আঞ্চলিক ও সারা বিশ্বের চেয়ে দ্বিগুণ হারে কমেছে। তবে এখনো প্রতি হাজারে ৩২ জন নবজাতক মারা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ডায়রিয়ার কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সীদের এক-পঞ্চমাংশ মারা যেত। তবে বর্তমানে ডায়রিয়ার কারণে মারা যাচ্ছে এই বয়সী মোট শিশুর মাত্র ২ শতাংশ। এ অগ্রগতির পেছনে খাবার স্যালাইন ভূমিকা পালন করেছে। জিঙ্ক ও খাবার স্যালাইন ব্যবহারের হার ২০০৭ সালের ২০ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে ৩৪ শতাংশ হয়েছে। ২০০৪ সালের দিকে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বার্থ এসফিকশিয়ায় বা জন্মকালীন শ্বাসরুদ্ধতায় মারা যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার বিষয়টি যোগ হয়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ৪৩ শতাংশই পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। দুই বছর বয়সী শিশুরা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১২ সালে পানিতে ডুবে মারা যায় ১৩৫ জন শিশু। তবে শিশুমৃত্যুর এ কারণটি প্রতিরোধে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দেশে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিশুমৃত্যুর নতুন নতুন কারণগুলোর প্রতি সরকারের নজর বাড়ানো উচিত।
পুষ্টির প্রতি গুরুত্ব: অপুষ্টির কারণে দেশে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪০টি, অর্থাৎ ঘণ্টায় ১০টি শিশু মারা যাচ্ছে। সর্বশেষ বিডিএইচএস বলছে, বর্তমানে ৪১ শতাংশ শিশু খাটো, ৩৬ শতাংশ শিশুর ওজন কম এবং ১৬ শতাংশ শিশু গায়ে চিকন বা রোগা।
জুলাই মাসে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত প্রভাবশালী চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট (মাতৃ ও শিশুপুষ্টিবিষয়ক সংখ্যা) বলছে, ১০টি পরীক্ষিত কর্মপন্থার বিস্তার ঘটালে বাংলাদেশসহ ৩৪টি উচ্চ অপুষ্টির দেশে বছরে নয় লাখ শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। পাঁচ বছরের কম বয়সী পৃথিবীর মোট খর্বকায় শিশুর ৯০ শতাংশ এসব দেশে বাস করে।
চ্যালেঞ্জ আছে অনেক: বিডিএইচএসের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৭১ শতাংশ প্রসবই হচ্ছে বাড়িতে, অদক্ষ ধাইয়ের মাধ্যমে। কমপক্ষে চারবার প্রসবপূর্ব সেবা নিচ্ছেন মাত্র ২৬ শতাংশ মা। দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে প্রসব করানোর সুযোগ পাচ্ছেন ৩২ শতাংশ মা। অর্থনৈতিক অবস্থানভেদে সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব করাচ্ছেন, দরিদ্র পরিবারে এ সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশ। ২০১১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক-তৃতীয়াংশ শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অথবা স্বাস্থ্যকর্মী পর্যন্ত যেতে পারছে, যা ২০০৭ সালের প্রতিবেদনেও মোটামুটি একই চিত্র ছিল।
বিডিএইচএসের ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে নবজাতক ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি পর্যায়ে উদ্যোগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে সে ধরনের তেমন কিছু নেওয়া হয়নি।
জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে বিশেষ নবজাতক ইউনিট গঠন করার কথা থাকলেও তা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি।
দেশে দক্ষ প্রসব সহায়তাকারী (এসবিএ) আছে ১৬ হাজার, ২০১৬ সালের মধ্যে তা ২৫ হাজার করার কথা। জন্মের পর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ দেওয়ার হার ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে সঠিকভাবে বাড়তি খাবার দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২১ শতাংশ শিশুকে।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ (মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য) রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী সরকার কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে। আগে বলা হতো, নবজাতকের নাভিতে কিছু লাগানোর দরকার নেই। কিন্তু বর্তমান কর্মসূচিতে নাভিতে ক্লোরোহেক্সিডিন লাগানোর কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টি জনগণকে জানাতে হবে। সময়ের আগে স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া (মোট নবজাতকের ২০ শতাংশ) নবজাতকের জন্য ক্যাঙারু মাদার কেয়ার চালু হয়নি। অসুস্থ নবজাতকদের সংক্রমণের ব্যবস্থাপনা হচ্ছে মাত্র ২৮ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এটি করতে হবে ৮০ শতাংশ। এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনবল ও আর্থিক বিষয়টি জড়িত। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও দাতা সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের ভিত্তিতেই এ পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সরকারের বেঞ্চমার্ক পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে ইউনিসেফ মনিটরিং অব রেজাল্ট উইথ ইক্যুইটি সিস্টেম (এমওআরইএস) নামের মডেল ব্যবহার করবে।
সুপারিশ: শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুপারিশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নতির পাশাপাশি কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাসের অনুশীলন ও প্রশিক্ষিত সেবাদানকারীদের কাছ থেকে সেবা নেওয়ার হার বাড়াতে হবে। নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ১৯৭৫ সালে নারীপ্রতি মোট প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ হার ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সন্তানসংখ্যা কমে যাওয়ায় মা ও শিশুমৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। তাই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মায়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত। তাই শিশুকে ভালো রাখতে হলে মায়ের স্বাস্থ্যের দিকে অবশ্যই নজর বাড়াতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

