পশ্চিমা বিশ্বে সন্তান লালন-পালনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ডায়াপার৷ ছোট্ট শিশুটি যাতে প্রশ্রাব করে বিছানা ভেজাতে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা৷ ছোট্ট শিশুটির যত্নের এমন রীতি কিন্তু পশ্চিমা দেশ ছাড়িয়ে প্রায় সব দেশেই এখন বেশ সমাদৃত।
তবে ডায়াপার কিন্তু শিশুর জন্য বিশেষ উপকারী নয়৷ পশ্চিমা দুনিয়াতেই বর্তমানে এর খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পাচ্ছেন বাবা মারা। তাই সেখানকার অনেকেই এর বিকল্প উপায় খুঁজে নিচ্ছেন৷
সাধারণত নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রশ্রাব করা শেখার আগ পর্যন্ত অধিকাংশ শিশুর গড়ে দুই থেকে তিন হাজার ডায়াপার ব্যবহার করতে হয়৷
জার্মানির কিছু অভিভাবক ডায়াপার ছাড়াই শিশুকে বড় করার চেষ্টা করছেন৷ আশার কথা হচ্ছে, ডায়পার ছাড়াও তাদের সন্তানরা কিন্তু প্রশ্রাব করে বিছানা ভেজাচ্ছে না৷
১৫ মাস বয়সি আলিসার কথাই ধরা যাক৷ তার মা ফ্রেয়ার ডোনারের বয়স ৩০ বছর৷ প্রতিদিন সকালে আলিসাকে বাথরুমের টয়লেটের উপরে নিয়ে যান ডোনার৷ এরপর মুখ দিয়ে ‘লু লু' শব্দ করতে থাকলে প্রশ্রাব করতে শুরু করে বাচ্চাটা৷
শুধু তাই নয়, ছোট বা বড় ‘প্রাকৃতিক কর্ম' সারার প্রয়োজন পড়লে বিভিন্ন সংকেতও দেয় আলিসা৷ এভাবেই ডায়পার ছাড়াই প্রথম সন্তান পালন করছেন ডোনার এবং তার স্বামী৷
প্রশ্রাব কিংবা পায়খানা সারার জন্য আপনার সোনামনিকে এভাবেই নানান ভঙ্গির সাংকেতিক ভাষায় অভ্যস্ত করে তুলতে পারেন। যাতে ও ওই সাংকেতিক ধ্বনিটি উচ্চারণ করা মাত্রই ও বুঝে ফেলতে পারে।
মজার বিষয় হচ্ছে, এমনটা শুধু তারাই করছেন না৷ ফিনল্যান্ড থেকে শুরু করে ইতালি অবধি ইউরোপের অনেক দেশের অভিভাবকরাই এভাবে সন্তান পালন শুরু করেছেন৷
ফ্রেয়ার ডোনারের কাছে অবশ্য শিশুকে ডায়পার না পরানোটা মুখ্য বিষয় ছিল না৷ তিনি চিন্তিত ছিলেন তার সন্তানের কান্না নিয়ে৷
ডোনার বলেন, “আলিসা খুব কাঁদতো৷ তাই তা নিয়ে ডায়পার ছাড়া শিশু পালন বিষয়ক এক বইয়ের লেখকের সঙ্গে কথা বলি আমি৷ তিনি জানান, শিশুরা কাঁদার মাধ্যমেই (অভিভাবকের সঙ্গে) যোগাযোগের চেষ্টা করে।”
তিনি বলেন, “ডায়পার না পরানোর দিন থেকে আলিসা কান্না অনেক কমিয়ে দিয়েছে৷ মনে হচ্ছে, সে এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট৷ আমরা খুব দ্রুত ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছি।”
ডোনার শুধু নিজের বাচ্চাকে ডায়পার না পরিয়েই ক্ষান্ত হননি৷ তিনি অন্য অভিভাবকদেরও এই বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন৷ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বেবিস উইদাউট ডায়াপার্স' নামক একটি সংগঠনের মাধ্যমে এই কাজ করেন ডোনার৷ বার্লিনে সংগঠনটির প্রশিক্ষণেও অংশ নিয়েছেন তিনি৷
ডায়াপারের ভাল মন্দ
ডায়পারের কারণে শিশুদের শরীরে সৃষ্ট ফুসকুঁড়ি প্রায় প্রতিদিনই দেখেন ড. হাইনরিশ রাটৎস। গত চার বছর ধরে শিশুদের ডায়পার না পরাতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করছেন এই চিকিৎসক৷
ড. রাটৎস বলেন, “ইংরেজিভাষী বিশ্বে এটাকে 'এলিমিনেশন কমিউনিকেশন' বা ইসি বলা হয়৷ মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু অনেক চিকিৎসক এখন এতে আগ্রহী।”
ছাত্রজীবনেই ড. রাটৎস জেনেছিলেন যে, প্রশ্রাবের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় একটি শিশুর ২৪ মাসের মতো সময় লাগে৷ কিন্তু ২০০৯ সালে এক শিশু দেখে বিস্মিত হন তিনি৷ ডায়পার পরায় সে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল৷ চিকিৎসক তখন তাকে ডায়পার না পরানোর জন্য তার বাবা-মাকে পরামর্শ দেন৷
ড. রাটৎস বলেন, “ক্লিনিক থেকে শিশুটির বাড়ির দূরত্ব ছিল গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টার পথ৷ তাই আমি শিশুটির মাকে বলেছিলাম, ক্লিনিক ত্যাগের আগে শিশুটিকে প্রশ্রাব করানোর চেষ্টা করতে৷ শিশুটি মায়ের নির্দেশে হিসি করেছিল৷”
তবে, জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ক্লিনিকের পরিচালক ড. রাইনার গানশ্যাও অবশ্য মনে করেন, শিশুদের ডায়পার ব্যবহার না করানোর নেতিবাচক দিকও আছে৷ বিশেষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকটি এভাবে নিশ্চিত করা কঠিন৷
তিনি বলেন, “আমি শিশুদের পুরোপুরি বা আংশিক ডায়পার না পরানোটা সমর্থন করলেও মনে করি যে ইসি নিয়ে আমাদের আরো গবেষণা দরকার। অধিকাংশ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞই এই পন্থা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না৷ তাঁদের অভিজ্ঞতারও ঘাটতি রয়েছে৷”
সুত্র - poriborton.com

