চিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। সেই আগুন ঘিরে বসে আছেন স্বজনেরা। পাশে দাঁড়িয়ে নির্বাক তাকিয়ে ছিলেন প্রীতির স্বামী মিন্টু দাশ। বাবা-ভাই সবার চোখে পানি। মা সবিতা দাশ বুক চাপড়াতে চাপড়াতে অজ্ঞান হয়ে পড়ায় বাড়িতে পাঠানো হয়।চট্টগ্রামের পশ্চিম পটিয়ার শাহমিরপুর গ্রামে বাবার বাড়ির শ্মশানে গতকাল রোববার বেলা একটায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় প্রীতির।গত শনিবার রাতে প্রীতি দাশ, তাঁর স্বামী মিন্টু দাশ, তাঁর বন্ধু বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন এবং আরেক বন্ধু মো. জাহিদুল আলম ট্রেনে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। প্রীতি ছিলেন জানালার পাশে।Untitled-27জাহিদুল জানান, ট্রেনটি কিছুটা ধীর গতিতে চলছিল। ১১টা ২০ মিনিটে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারির ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর বাইরে থেকে জানালা লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।একটি পাথর প্রীতির মাথার বাঁ পাশে লাগে। মুহূর্তেই শব্দ করে হেলে পড়েন তিনি। পাথরে মাথা ফাটেনি।তবে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ সময় প্রথমে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সন্দ্বীপের কালাপানিয়ায় প্রীতির শ্বশুড়বাড়ি। প্রীতি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছিলেন। ১৭ মাস আগে বিয়ে হয় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী প্রীতির। স্বামী মিন্টু দাশ ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ঢাকা প্রধান শাখার কর্মকর্তা। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট প্রীতি। শ্মশানঘাটে দাঁড়িয়ে মেজ ভাই রাজীব দাশ বলেন, ‘আমাদের চার ভাইয়ের আদরের ছোট বোন। অনেক জাঁকজমক করে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরি করবে, এমন আশা ছিল। সব শেষ। কী দোষ ছিল তাঁর।’‘চার দিনের জন্য তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। ঢাকায় বেড়িয়ে ১৫ আগস্টের ছুটিতে ফিরে আসব এমন পরিকল্পনাই ছিল...’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে মিন্টুর।
ঢাকায় যাওয়ার আগে শনিবার রাতে মামার বাসায় নিমন্ত্রণও খেয়েছেন প্রীতি ও মিন্টু। তার দুই দিন আগে বাবার বাসায় ঘুরে গেছেন। সেই স্মৃতি ভুলতে পারছেন না বাবা ও ভাইয়েরা। বাবার বলেন, ‘আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে কাল (শনিবার)। তার মামার বাসায় নিমন্ত্রণ ছিল। ট্রেনে ওঠে ফোন করল বাবা ট্রেন ছেড়েছে। কথা বলল তার মায়ের সঙ্গেও। আমরা বললাম সাবধানে যাস। আধঘণ্টা পর সেই মর্মান্তিক খবরটি এল। কেন ঠাকুর এমন বিচার করল। চার ছেলের পর একমাত্র মেয়ে। দিয়েও কেন নিয়ে গেল?’
চিতার আগুনের তেজ কমে আসছিল ধীরে ধীরে। প্রীতিকে হারিয়ে জ্বলে ওঠা স্বজনদের বুকের আগুন নিভতে কত সময় লাগবে, কে জানে...।
সুত্র - প্রথম আলো

