শিক্ষকের পিটুনিতে আহত হয়ে ২৩ দিন ধরে নির্বাক ফেনী সদর উপজেলার কালিদহ এস সি উচ্চ বিদ্যালয়ের মিরাজুল আলম নামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। বর্তমানে সে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক বলেন, 'শ্রেণিকক্ষে দুষ্টামির জন্য তাকে মাত্র দু'তিনটি বেত্রাঘাত করা হয়েছে। পরদিনও সে বিদ্যালয়ে আসে। তখনো অসুস্থ হয়নি সে।'
মিরাজুলের চিকিত্সক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ঝুনু শামসুন নাহার বলেন, এখন পর্যন্ত সে কথা বলতে পারছে না। আসলে কি হয়েছিল, তা জানা যাচ্ছে না। তবে তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও ভীতির ছাপ আছে। সে মানসিকভাবে অসুস্থ। দু'তিনটি বেত্রাঘাতে এমন অসুস্থ হতে পারে কি-না জানতে চাইলে ঝুনু শামসুন নাহার বলেন, কখনো কখনো একটি থাপ্পড়েও এমন হতে পারে।
মিরাজুলের মা লায়লা বেগম জানান, ওইদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর ছেলের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ তিনি লক্ষ্য করেন। হঠাত্ করে সে খাওয়া-দাওয়া ও কথাবার্তা বন্ধ করে দেয় এবং ওর হাত-পা কুঁকড়ে যায়। ঘটনার একদিন পর থেকে তার মধ্যে মানসিক অসুস্থতা দেখা দেয়।
পরিবারের অভিযোগ, ৮ জুলাই শ্রেণিকক্ষে দুষ্টামির অজুহাতে ওই শিক্ষক তাকে বেত দিয়ে বেধড়ক পেটান। একপর্যায়ে শিক্ষকের পায়ে ধরেও সে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে বলে বিদ্যালয়ের এক প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র জানায়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শিশুদের যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া অপরাধের শামিল।
'কি কন? মাইরের ওপর কোনো ওষুধ নাই। পড়া শিখবো না মানে, মাইরের চোটে বাপ, বাপ কইরা শিখবো।' রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ভাষ্য এটি। আপত্তি থাকায় তার নাম এবং বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশ করা হলো না। শিক্ষার গুণগত মানের বিষয়টি সম্পর্কে এই প্রতিবেদক জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক বলেন, 'শিক্ষার আবার গুণগত মান কি? বাচ্চাদের মাথায় পড়া ঢুকাইতে হইবো। ইবলিশগুলোর মাথায় পড়া ঢুকানোর উপায় একটাই-বেত মারা।' শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ, শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া যাবে না-প্রসঙ্গটি চায়ের কাপের ধোঁয়ার মতো এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিলেন ওই শিক্ষক। তিনি উল্টো প্রতিবেদকের কাছে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, 'সরকার কি এসব বাঁদর ছেলেমেয়েদের পড়ায়? সেই কঠিন কাজটি করি আমরা। আমরা বুঝি শিক্ষার্থীদের জন্য কোন্টা ভালো কোন্টা মন্দ।'
এটি শুধু একজন শিক্ষকের বক্তব্য নয়, অনেক শিক্ষকই এ ধরনের ধারণা পোষণ করেন। আর এ ধারণা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাদ্রাসা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েগুলোতে। যেখানে দরিদ্র এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা পড়াশুনা করে। বিশেষ করে যেসব স্কুল ও মাদ্রাসা শহর-নগরের একটু বাইরে বা যেখানে সচেতন অভিভাবক নেই, সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বই-খাতা না আনলে বা পড়া সামান্য ভুল করলেই উল্টাপাল্টা মারধর করেন। এসব শিক্ষকের মারধরের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে কোনো কোনো শিক্ষার্থী।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক শাস্তি অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি দেয়া শিশুদের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকারের লংঘন। শিক্ষকদের নিষ্ঠুর, অমানবিক শাস্তির ফলে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়।
শিশু সংগঠন চাইল্ড পার্লামেন্ট একটি জরিপ করেছে। চাইল্ড পার্লামেন্ট শিক্ষা ও সুশাসন বিষয়ে গত বছর মার্চ মাসে ৬৪টি জেলার ৬৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ২৮০ জন শিক্ষার্থীর ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। শিক্ষার্থীরা চতুর্থ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী।
সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করার পরও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন বন্ধের ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সালে ৬৯ শতাংশ ছাত্রছাত্রী শিক্ষকদের হাতে শাস্তি পাওয়ার কথা বলেছিল। ২০১১ সালে ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী একই অভিযোগ করেছে।
জানা গেছে, পরিবারে বাবা-মা এবং বড়দের দ্বারাও শিশুরা দুষ্টুমি ও ছোটখাট অপরাধের কারণে নানা ধরনের দৈহিক শাস্তির শিকার হয়। সেইসঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট ভুল ও পরীক্ষায় পরিবারের প্রত্যাশানুযায়ী ফলাফল না করতে পারায় নানা ধরনের অপমান ও কটাক্ষমূলক মন্তব্য শুনতে বাধ্য হয়। পরিবারের প্রিয় সদস্যটির দ্বারা কথায় কথায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্যমূলক বক্তব্যের দ্বারা এবং দৈহিক শাস্তির ফলে কোমলমতি শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত্ গঠনে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

