ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ব্যক্তিগত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে বরগুনা-২ (বাবনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলা) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম সবুরের (৫৮) মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ভাঙ্গার চুমুরদি বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে।
এ দুর্ঘটনায় সাংসদের এক ভাইসহ আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এঁরা হলেন সাংসদের ভাই গোলাম শহীদ নীলু (৬০), পাথরঘাটা আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুন অর রশিদ (৫৫), সাংসদের ব্যক্তিগত সহকারী মো. শহিদুল ইসলাম (৩২) ও গাড়িচালক সগির হোসেন (৩৫)। এঁদের মধ্যে সাংসদের ভাই গোলাম শহীদ ও শিক্ষক হারুন অর রশিদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির জানান, সাংসদ গোলাম সবুর বরগুনার বেতাগীতে একটি দলীয় অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। পথে ফরিদপুর-বরিশাল সড়কে বিকেল পৌনে চারটার দিকে ভাঙ্গার চুমুরদি বাসস্ট্যান্ডের কাছে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে গাড়িটি উল্টে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে গুরুতর আহত গাড়িটির সবাইকে উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা ইমরান হোসেন জানান, দুর্ঘটায় আহত পাঁচজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাংসদ গোলাম সবুরকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত চারজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আ স ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী জানান, সাংসদের ভাই ও শিক্ষকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁরা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। গাড়িচালক ও সাংসদের একান্ত সচিবকে ফরিদপুর মেডিকেলে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সাংসদ গোলাম সবুর বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা গ্রামের মৃত ফয়জদ্দিন হাওলাদারের ছেলে। ছয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ঘটনার তিন দিন আগে তিনি বরগুনায় আসেন। তাঁর তিনটি মেয়ে রয়েছে। তিনি মধুমতি সিরামিকস ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক, এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক মরহুম আবদুল খালেক খানের জামাতা।
গতকাল সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে গোলাম সবুরের মরদেহ ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বুঝে নেন তাঁর বড় ভাই গোলাম সিদ্দিক। এ সময় ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর হোসেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সাংসদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাংসদের মরদেহ সরাসরি ঢাকার নিউ ইস্কাটনে তাঁর নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। পরে আজ শনিবার পাথরঘাটায় সাংসদের মরদেহ আনা হবে বলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পাথরঘাটা কেএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ জোহার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে উপজেলার কালমেঘা পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জামিল হাসান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর হোসেন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
বরগুনায় শোকের ছায়া: আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা ও পাথরঘাটা প্রতিনিধি জানান, সাংসদ গোলাম সবুরের মৃত্যুর খবর বরগুনায় পৌঁছালে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। বরগুনা-২ আসনের সাংসদ হলেও তিনি গোটা জেলায় একজন দানশীল ও সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পাথরঘাটার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মাসউদ সিকদার বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকাকালে একজন সাংসদ ঘুষ নেন না, দুর্নীতি করেন না—আমাদের দেশে এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। তাঁর শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার বলেন, তাঁর অকাল মৃত্যুতে একজন সৎ ও গতানুগতিক কুটিল রাজনৈতিক ধারাবিরোধী একজন নেতার সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হলো বরগুনার মানুষ।
সূত্র - প্রথম আলো

