মাথার ওপর শুধু টিনের একটি ছাউনি। চারদিক খোলা। পাথরভাঙা কলের (স্টোন ক্রাশিং মিল) বিকট শব্দ। সঙ্গে পাথরভাঙা গুঁড়ায় ধূলিময় আশপাশ। নাক-মুখ চেপে পাথর পরিবহনের কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। ধূলিকণা ও বিকট শব্দ থেকে রেহাই পেতে এলাকার বাসিন্দারা কল এড়িয়ে পথ চলছিলেন। সম্প্রতি সিলেট সদর উপজেলার ধোপাগুল-সাহেববজার এলাকায় গিয়ে সিলেট-কোম্পানীঞ্জ সড়কে অবস্থিত ‘মায়ের দোয়া স্টোন ক্রাশার মিল’ নামের পাথর ভাঙার কলে এমন দৃশ্য দেখা গেল।
ধোপাগুল-সাহেববাজারসহ কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও জাফলং এলাকায় এ ধরনের পাঁচ শতাধিক কল রয়েছে। এর মধ্যে ১০২টি কল রয়েছে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের আশপাশের এলাকায়।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত কল স্থাপন নীতিমালার প্রধান শর্তের মধ্যে রয়েছে ‘অঞ্চল’ (জোন) ছাড়া পাথরভাঙা কল স্থাপন করা যাবে না। সিলেটের পাথর উত্তোলনস্থলের আশপাশের এলাকায় প্রশাসন কল স্থাপনের নির্দিষ্ট অঞ্চল ঘোষণা করেনি। ফলে যত্রতত্র স্থাপন করা হচ্ছে পাথর ভাঙার কল।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পাথরের গুঁড়া নির্মাণকাজের অপরিহার্য উপাদান হওয়ায় পাথর উত্তোলনস্থলের আশপাশে যত্রতত্র কল স্থাপন করা হচ্ছে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ এবং জাফলং বাংলাদেশের বৃহৎ পাথর কোয়ারি (উত্তোলনস্থল) হওয়ায় কলগুলোর স্থাপনাও ওই এলাকাকেন্দ্রিক। কলগুলোকে নীতিমালার মধ্যে আনতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ ও স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা (সংশোধিত ২০১৩)’ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কার্যকর করার কথা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক বছর ধরে নীতিমালার প্রথম শর্ত অনুযায়ী কল স্থাপনে ‘অঞ্চল’ নির্দিষ্ট করার বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর প্রক্রিয়াধীন রেখেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থাপন নীতিমালা না থাকায় যত্রতত্র কল স্থাপিত হচ্ছে। পাথর গুঁড়ার ধূলিকণায় আশপাশের লোকজন ও শ্রমিকেরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। একেকটি কলে মজুরিভিত্তিক ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। নারী, পুরুষ ছাড়াও শিশু শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে।
সিলেট সদরের ধোপাগুল, সাহেবাজার ও কোম্পানীগঞ্জের সালুটিকর এলাকায় চালু কয়েকটি কল ঘুরে দেখা গেছে, কলগুলো উন্মুক্ত থাকায় এলাকাবাসী ও শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাঁরা পাথর গুঁড়া থেকে নিজেকে রক্ষায় স্বতন্ত্র ব্যবস্থা নিলেও কলের মালিকপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই।
আলাপকালে সালুটিকর এলাকার তিনটি কলে নিয়োজিত শ্রমিকেরা পাথর ভাঙার গুঁড়ায় চোখ জ্বালাপোড়ার কথা জানান। কয়েকজন হাত-পায়ে ক্ষত হওয়ার বিষয়টিও দেখান।
উন্মুক্ত কল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করেন সিলেটের সিভিল সার্জন আজাহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পাথরের ধূলিকণা শ্বাসনালিতে ঢুকে ফুসফুসের ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে টিউমারের সৃষ্টি হতে পারে। চোখ জ্বালাপোড়া, হাঁপানি, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও আলসারের জন্যও পাথরের কণা ঝুঁকিপূর্ণ।’
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কলে কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, জানতে চাইলে সাহেববাজারের ‘যাদুকাটা স্টোন ক্রাশার’ কলের মালিক আবু তৈয়ব বলেন, ‘শুধু শ্রমিক কেন, আমরাও তো ঝুঁকির মুখে রয়েছি।’
কলের যত্রতত্র অবস্থান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বলে জানান সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা। তিনি বলেন, পাথরভাঙা কল নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে না আনা পর্যন্ত এ অবস্থা থেকে প্রতিকারের কোনো পথ নেই।
পাথর ভাঙার নির্দিষ্ট অঞ্চল না হওয়ায় কলের পরিবেশের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না স্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক এস এম ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘নীতিমালা প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হচ্ছে জেলা প্রশাসন। প্রথমত এগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। এ কাজ হয়ে গেলে আমরা দেখব কলগুলো নীতিমালার অন্যান্য দিক মেনে যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না?’
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এনামুল হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করে অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যে এলাকায় বেশি কল, সেগুলোকে পল্লী বা অঞ্চল ঘোষণা করা হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

