রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে কয়েক ঘণ্টা চাপা পড়ে থাকার পর উদ্ধার হয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক মো. সজীব। প্রায় দুই মাস সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার পরও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না তিনি।
এখন সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) ভর্তি হয়ে সজীব জেনেছেন, তাঁর মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে গেছে। মেরুদণ্ডের কোনো চিকিৎসাই আগে তিনি পাননি।
কয়েক ঘণ্টা মাথা চাপা পড়ে থাকার পর উদ্ধার হয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক শিউলি আক্তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ দিন চিকিৎসা পেয়েছিলেন তিনি। এখন মাথা-চোখে প্রচণ্ড যন্ত্রণা, চুলশূন্য মাথায় ফোলা ঘা আর বিকৃত চেহারা নিয়ে বাড়িতেই ধুঁকছেন শিউলি।
সাভারের সিআরপি ও ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক বলছেন, এলাকার এনাম হাসপাতাল এবং বিশেষত ছোটখাটো ক্লিনিকে অপ্রতুল বা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত শ্রমিক পরে তাঁদের কাছে এসেছেন। এই চিকিৎসকেরা মনে করছেন, উদ্ধার-পরবর্তী সময়ে এসব হাসপাতাল প্রয়োজনীয় সেবাটুকু দিয়েছে। তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের জন্য প্রতিকারের তাগিদ থেকে এ বিচ্যুতিগুলোর কথা বলা দরকার।
হাসপাতালে আর বাড়িতে ধুঁকতে থাকা আহত শ্রমিক ও তাঁদের স্বজনেরাও যথাযথ চিকিৎসা না হওয়ার অভিযোগ করছেন।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর ২০ দিনে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় দুই হাজার ৪৩৮ জনকে, যাঁদের ১৬ জন পরে মারা যান। মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজার ১৩১ জন। এ ছাড়া হাত-পা কাটা ও পক্ষাঘাতগ্রস্তের শিকার হন ৩৬ জন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই থেঁতলে যাওয়া, উদ্ধারের সময় কেটে-ছিলে যাওয়া, শরীরে ইট-কংক্রিট পড়া থেকে শুরু করে হাড়ভাঙা, দীর্ঘ সময় শরীরের কোনো অংশে ভারী জিনিস চাপা পড়ে থাকাজনিত গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁদের প্রায় সবাইকে স্থানীয় হাসপাতালসহ ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এর বড় অংশটিই ১০ দিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো শুধু প্রাথমিক বা সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার চিকিৎসা আর ব্যথার ওষুধ দিয়ে রোগীদের ছেড়ে দিয়েছে। তাঁদের একাংশের পরে নানা রকম জটিল সমস্যা দেখা দেয়।
রানা প্লাজার কাছাকাছি শ্রমিক-অধ্যুষিত তিনটি গ্রামে ঢুকলেই অনেকে এমন সমস্যার কথা শুনতে ঘরে ডাকেন। গত কয়েক সপ্তাহে মোট ২৬ জনের সঙ্গে কথা বলা গেছে, যাঁদের কমবেশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার দরকার। মেরুদণ্ডের ক্ষতিসহ অঙ্গহানি বা গুরুতর আঘাত ও ক্ষত নিয়ে দুটি হাসপাতাল—পঙ্গু ও সিআরপিতে এখন মাত্র ৭২ জন ভর্তি রয়েছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন।
ভুল বা অপ্রতুল চিকিৎসার অভিযোগ: ধসে পড়া ভবনের চাপে কুঁকড়ে বসে গিয়েছিলেন সজীব। মেরুদণ্ডের সমস্যা নিয়ে বর্তমানে তিনি সাভারের সিআরপিতে ভর্তি আছেন। প্রায় দুই মাস এনাম হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত ২০ জুন তিনি সিআরপিতে ভর্তি হন। এনামে তাঁর পেটে ও বুকে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকেরা মেরুদণ্ডে আঘাতের কথা কিছু বলেননি। সিআরপির চিকিৎসকেরা বলছেন, এখন সজীবের মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে।
কিশোরী শ্রমিক আয়েশা বেগমের পিঠে দালানভাঙা ইটের স্তূপ পড়েছিল, এখন মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা। ভবনটি ধসের দুই দিন পর উদ্ধার হয়ে আয়েশা ১০ দিন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিলেন। আয়েশার নানা হজরত আলী বলেন, পরে সিআরপিতে নিলে চিকিৎসকেরা দেখেন, মেয়েটির বুকের এক্স-রে করা হয়েছিল। অথচ তাঁর ব্যথা ছিল পিঠে। চিকিৎসক যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন, তা মেয়েটির মেরুদণ্ডের সমস্যা সারাতে পারেনি। তাই ঘটনার দুই মাস পর তাঁকে সিআরপিতে ভর্তি হতে হয়েছে।
এনাম হাসপাতাল থেকে দেওয়া লাইলির ব্যবস্থাপত্রে লেখা হয়েছে, তাঁর ডান পায়ে ঘায়ের ক্ষত। কিন্তু ক্ষতটি আসলে বাঁ পায়ে।
একজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, কয়েকজন রোগীকে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ আর গ্লুকোজ স্যালাইন দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, তাঁদের কাছেও অনেক রোগী এসেছেন, যাঁদের তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়। তাঁদের ব্যবস্থাপত্রে শুধু কয়েকটি ব্যথানাশক ওষুধ লেখা রয়েছে। এ ছাড়া সমস্যার বিবরণ বা ইতিহাস কিছুই লেখা নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার মতো অবস্থানে না থাকায় এই চিকিৎসকেরা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
অভিযুক্ত হাসপাতালের বক্তব্য: ভবনধসে আহত শ্রমিকদের এক হাজার ৭০০ জনই চিকিৎসা পেয়েছিলেন সাভারের এনাম হাসপাতালে। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান এনামুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর হাসপাতালে থাকার সময় সজীবের মেরুদণ্ডের সমস্যার উপসর্গগুলো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপত্র লেখায় হঠাৎ ভুল হতে পারে। তবে চিকিৎসা নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া, নতুন করে সমস্যা দেখা দিলে তাঁর হাসপাতালে ফলোআপ চিকিৎসা নেওয়া যাবে।
বাড়িতে ধুঁকছে ওঁরা: রানা প্লাজার পাঁচটি পোশাক কারখানার অনেক শ্রমিক ধ্বংস হওয়া ভবনটির পেছনে মজিদপুর ও ইমান্দিপুর গ্রাম, পার্শ্ববর্তী বাড্ডা ও ব্যাংক কলোনি এলাকায় টিনচালা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আহত শ্রমিকদের অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন, আবার অনেকে এখানেই ধুঁকছেন।
মজিদপুর দোতলা মসজিদ-সংলগ্ন এলাকায় আছেন শিউলি আক্তার। মাথার নিচে সেলাই মেশিন আর ওপরে ছাদ চাপা অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা পড়ে ছিলেন রানা প্লাজার আটতলায় কর্মরত এই পোশাকশ্রমিক। প্রাণে বেঁচেছেন, কিন্তু জীবন এখন প্রচণ্ড যন্ত্রণাময়। শিউলির মাথায় কোনো চুল নেই, মাথার দুই পাশ ঘা হয়ে ফুলে উঠেছে। সব সময়ই মাথা ব্যথা করে। হাঁটাচলা করলে ব্যথা বেড়ে যায়। ডান চোখ নাড়াতে পারেন না, ব্যথা সার্বক্ষণিক। আয়নায় চোখ পড়লে বিকৃত চেহারা দেখে নিজেই আঁতকে ওঠেন।
শিউলি বলেন, ভবনধসের পর ২৫ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকলেও সুস্থ হননি। মাথায় আর চুল উঠছে না। ২০ জুন একবার ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। কিন্তু বাসে চড়ে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখন তাই ঘরেই পড়ে আছেন।
১৯ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক তানিয়া ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁর মা সাজেদা বেগম জানান, ভবনধসের তিন ঘণ্টা পর নিজে নিজেই এসেছিলেন তানিয়া। তবে মাথায় আঘাত ছিল আর গলা দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। স্থানীয় এক ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তানিয়া বাসায় চলে আসেন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে তাঁর গলা দিয়ে আবারও রক্ত পড়ছে। এখনো ঘুমের মধ্যে আতঙ্কে চিৎকার করেন তানিয়া।
সাভারের বাড্ডার ভাটপাড়ার মাহফুজা বেগমকে (৩০) ধসের ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধার করে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পাঁচ দিন পর তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর আঘাত ছিল ঘাড়ে ও কোমরে। তিনি বলেন, পুরো শরীরে সারাক্ষণ অসহ্য ব্যথা, প্রায়ই হাত-পা অবশ হয়ে আসে। খাবার যেন বুকে আটকে যায়।
ছয় দফা হাসপাতাল বদল: ধসের পরপর পোশাকশ্রমিক শিরিনা আক্তারকে উদ্ধার করে এনাম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিনই সেখান থেকে তাঁকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকেরা বলেন, তাঁর বাঁ পা একাধিক জায়গায় ভেঙেছে আর ডান পা থেঁতলে রক্ত জমেছে। ডান পা কেটে ফেলতে হতে পারে। শিরিনা রাজি না হলে তাঁকে হূদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ডান পায়ে জমে থাকা রক্ত বের করা হয়। এদিকে রক্ত চলাচলে সমস্যার কারণে তাঁর কিডনি অকেজো হয়ে পড়তে থাকে। রক্ত ডায়ালাইসিসের জন্য তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বেশ কয়েকবার ডায়ালাইসিসের পর তাঁকে পাঠানো হয় বারডেমে। তারপর ২৬ মে তিনি আবারও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁর ডান পায়ের পাতায় এখনো কোনো সাড়া নেই।
শিরিনার আতঙ্ক কাটছে না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি বলেন, আর কখনো পোশাক কারখানায় কাজ করবেন না। কাজে ঢোকার আগে তিনি খুলনার ডুমুরিয়া মহিলা কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছিলেন। সুস্থ হলে বাড়ি ফিরে পড়াশোনা করবেন।
শিরিনার চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। আহত ব্যক্তিদের সবাই কমবেশি চিকিৎসার খরচ পাচ্ছেন।
সূত্র - প্রথম আলো

