সবিতা যখন মাত্র প্রথম শ্রেণীতে পড়ে, তখন তার মা প্রায় বাবার বয়সী একজনের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেন। স্বামী কাছে এলেই সবিতা ভয় পেত। তবে বিয়ের বছর ঘুরতে না-ঘুরতেই সবিতা মা হয়েছে। এখন তার বয়স ১৬ বছর। আর ছেলের বয়স চার। ১১ বছরের কম বয়সে বিয়ে হওয়ায় সবিতার অপুষ্ট শরীরে বুকে দুধ ছিল না। দুধ যেটুকু ছিল তা কীভাবে খাওয়াতে হবে তা-ও তার জানা ছিল না। সবিতা পরে আরেকটি সন্তানের জন্ম দেয়। চরম অপুষ্টির শিকার হয়ে দ্বিতীয় সন্তানটি মারা যায়।
২০০৮ সালে সবিতার মা মেয়ে ভালো থাকবে, নিরাপদ থাকবে, বস্তির ছেলে-ছোকরাদের হাত থেকে রেহাই পাবে—এ চিন্তা থেকেই বিয়ে দিয়েছিলেন। যৌতুক না পেয়ে এবং নেশায় আসক্ত স্বামী একদিন সবিতাকে তাড়িয়ে দিলেন। এখন সে নগরের কমলাপুরের ধলপুর বস্তিতে মায়ের আশ্রয়ে আছে। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে সবিতা ও তার ছেলের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
শুধু সবিতা নয়, বাংলাদেশ জনমিতি এবং স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০১১ বলছে, ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ৬৬ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ১৯ বছরের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন কিশোরী গর্ভধারণ করছে বা মা হচ্ছে।
গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশে কৈশোর মাতৃত্বের হার ৩৩ শতাংশের আশপাশ দিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এই সবিতার মতো কিশোরীরা দেশের বিভিন্ন অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে কৈশোর মাতৃত্ব একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। একইভাবে শিশুমৃত্যু কমানো, শিক্ষা, মোট প্রজনন হার কমানো, দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন সূচক অর্জনই কঠিন হয়ে যাচ্ছে এই সবিতাদের জন্য। এরা নিজের জীবনেরই উন্নতি করতে পারছে না, দেশের উন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখবে।
সবিতার ছেলে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের একটি প্রকল্পের আওতায় গত বছর থেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সবিতা লেখাপড়া জানলে এ সংগঠন একটি চাকরি দিতে পারত। কিন্তু সে সুযোগও নেই।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (কমলাপুর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) উইলিয়াম গোমেজ প্রথম আলোকে বলেন, সবিতা একা নয়, তিন মাস আগে ধলপুর বস্তিতে এক জরিপে ১৩৯ জনকে পাওয়া যায়, যারা বাল্যবিবাহের শিকার এবং বেশির ভাগই সন্তান জন্ম দিয়েছে।
২০১৫ সাল নাগাদ প্রজননস্বাস্থ্যে বৈশ্বিক অভিগম্যতা অর্জন করার লক্ষ্যমাত্রায় কিশোর বয়সে সন্তান জন্মদানের হারকে সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৯৩-৯৪ সালের বিডিএইচএস অনুযায়ী, দেশে কৈশোর মাতৃত্বের হার ছিল ৩৩ শতাংশ। ১৯৯৯-২০০০ সালে ৩৫ শতাংশ, ১৯৯৬-৯৭ সালে তা ৩৬ শতাংশ হয়। ২০০৪ সালে এবং ২০০৭ সালের জরিপে এটি আবার ৩৩ শতাংশ হয়। ২০১১ সালের বিডিএইচএসের সর্বশেষ প্রতিবেদনেও এ হার বলতে গেলে প্রায় অপরিবর্তিতই ছিল। অর্থাৎ দুই দশক ধরে এ সংখ্যা মোটামুটি একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজের মতে, বাল্যবিবাহ ও কৈশোর মাতৃত্ব নারীর ক্ষমতায়নে বাধা দিচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়াতেও সহায়তা করছে।
মেহের আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মেয়েদের ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়—এ ধরনের আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। দারিদ্র্য, নিরাপত্তার অভাব, অসচেতনতা প্রভৃতি কারণে ১৫ বছরের কিশোরীকেও অভিভাবকেরা বিয়ে দিচ্ছেন। এতে করে সেই কিশোরীর শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। যৌতুকসহ পারিবারিক নির্যাতনের শিকারও বেশি হচ্ছে এই কিশোরীরা।
১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সে প্রতি হাজারে ১১৮ জন গর্ভধারণ করছে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের কিশোরীদের এক-তৃতীয়াংশ এবং ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সের তিন-চতুর্থাংশই সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ কিশোরী কৈশোর বয়সেই গর্ভধারণ করছে। অথচ সন্তান নেওয়ার জন্য কিশোরীর শরীর ও মন প্রস্তুত থাকে না। মা হতে গিয়ে কিশোরী মা ও সন্তানের মৃত্যু হচ্ছে। মারা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা দেখা দিচ্ছে মায়ের শরীরে।
অন্যদিকে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই কিশোরীদের কাছে অনেক তথ্যই অজানা থাকে। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১২ অনুযায়ী, কিশোর-কিশোরীদের মাত্র ৬৩ শতাংশ সপ্তাহে কমপক্ষে একবার কোনো একটি তথ্য মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ পায়। বিয়ের পরে তাড়াতাড়ি সন্তান নেবে না, তা বলার ক্ষমতা থাকে না এই কিশোরীদের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সে বিবাহিত কিশোরীদের মাত্র ৪৭ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০১২ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাল্যবিবাহ বেশি এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। এ ছাড়া এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে চারটি দেশে খুব কম বয়সে মেয়েরা (১৪ বছর বা কম) যৌন সম্পর্কের শিকার, সে দেশের তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম আছে। ধর্ষণ বা বিয়েবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কারণে যেসব কিশোরী মা হতে বাধ্য হয়, তাদের অবস্থা হয় আরও নাজুক। সমাজ এমনকি পরিবারও সেই কিশোরীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রের পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের এক-তৃতীয়াংশ কিশোরীরই ওজন কম। এই মায়েদের জরায়ুর ভেতরে সন্তানের ওজন বাড়তে পারে না। স্বল্প ওজনের সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন করে অপুষ্টির যাত্রা শুরু হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মা ও শিশুস্বাস্থ্য সার্ভিসেসের উপপরিচালক গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, কৈশোর মাতৃত্বের কারণে মোট প্রজনন হারও কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিষয়টি সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে তা সরাসরি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
চাই সম্মিলিত উদ্যোগ: কৈশোর মাতৃত্ব শুধু একটি স্বাস্থ্যসম্পর্কিত বিষয় নয়। এর সঙ্গে দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ গুটিকয়েক মন্ত্রণালয় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কার্যক্রমগুলো যে যথেষ্ট নয় বা কাঠামোবদ্ধ রূপ পায়নি, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই স্বীকার করছেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা অধিদপ্তর সারা দেশে ৩৭৯টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব পরিচালনা করছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কৈশোর মাতৃত্ব প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি কোনো কার্যক্রম নেই। কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার ফলে বাল্যবিবাহ এবং কৈশোর মাতৃত্বের হার কমে আসছে। তবে মাত্র দুই বছরের মাথায় এ কার্যক্রমের শতভাগ সফলতা দাবি করা যাবে না। এ ধরনের ক্লাবের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।
সূত্র - প্রথম আলো

