সব শিশু পাচ্ছে না সেবা
30 June,13
Posted By: Healthprior21
Viewed#: 27
দুই হাত ধরে বাবা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন লাবিবাকে। বাবার হাত ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাচ্ছে লাবিবা। তার ভারী শরীরটি টানতে বাবাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ট্যাক্সিক্যাব থেকে নেমে এটুকু আসতেই বাবা মাশুকুর রহমানের ঘাম ছুটে যায়। অবশেষে তিনি মেয়েকে নিয়ে পৌঁছান কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। রাজধানীর মিরপুরের ১৪ নম্বরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে প্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি সেবা ও সাহায্যকেন্দ্রে ২০ জুন এ দৃশ্য দেখা যায়।
কথা হয় মাশুকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর মেয়ে লাবিবা জন্ম থেকে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার বয়স ১৩ বছর। তার দুটো পা-ই বাঁকা। তাই হাঁটতে পারে না। একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে তিনি এই সেবা ও সাহায্যকেন্দ্রে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। এখানকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সপ্তাহে পাঁচ দিন আসতে। কিন্তু তাঁর বাসা হচ্ছে কমলাপুরে। সেখান থেকে ট্যাক্সিক্যাব করে মিরপুর আসাটা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুল। তিনি সামান্য বেতনের চাকুরে। যদিও তাঁর মেয়ের বিনা মূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে। কিন্তু তাঁর পক্ষে এই যাতায়াতের ব্যয় বহন করা দুঃসাধ্য একটি ব্যাপার।
মাশুকুর রহমান জানান, হয়তো বেশি দিন এই চিকিৎসা চালানো সম্ভব হবে না। এখানে যদি রোগীর থাকার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো তিনি মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারতেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র চালু করে। প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রে সপ্তাহের পাঁচ দিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। তিনজন চিকিৎসক রোগী দেখেন।
এই সেবাকেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট তাহমিনা সিদ্দিকা জানান, সারা দেশে এ রকম ৬৮টি সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র আছে। এখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী আসে। বেশির ভাগই শিশু। এর মধ্যে আবার সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশু বেশি আসে। প্রত্যেক রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফিজিওথেরাপি, আকুপাংচার থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি দেওয়ার পাশাপাশি সহায়ক উপকরণ, যেমন হুইলচেয়ার, ট্রাইসাইকেল দেওয়া হয়। তবে কোনো ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় না।
তাহমিনা বলেন, ‘আমাদের এখানে রোগী ভর্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে আমরা রোগীর অভিভাবকদের এমনভাবে পরামর্শ দিই, যাতে তাঁরা বাড়িতেও প্রতিবন্ধী শিশু বা ব্যক্তির যথাযথ যত্ন নিতে পারেন।’
সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র ছাড়াও প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসার জন্য আছে শিশু বিকাশ কেন্দ্র। ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও দেশের ১০টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ধরনের কেন্দ্র আছে। ১৯৯২ সালে প্রথম ঢাকা শিশু হাসপাতালে বেসরকারিভাবে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু হয়। পরে ২০০৯ ও ২০১০ সালে সরকারি ১০টি হাসপাতালে কেন্দ্রগুলো চালু হয়। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত (এইচএনপিএসপি) কর্মসূচির বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্প। হাসপাতালগুলোর শিশু বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে একজন করে শিশু চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, থেরাপিস্ট ও সাইকো স্পেশাল কাউন্সিলরসহ মোট পাঁচজন কর্মরত আছেন। এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন বহু প্রতিবন্ধী শিশুকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়।
কথা হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সাইদা জামালউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের মতো রোগী আসে। এর মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর, সেসব শিশুকে ভর্তি করা হয়। এই কেন্দ্রে ২০টি শয্যা আছে। শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তির প্রয়োজন হলে অন্য ওয়ার্ডে শিশু ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক গিয়ে তাকে চিকিৎসা দিয়ে আসেন। শয্যা খালি হলে অন্য ওয়ার্ডে নেওয়া শিশুকে আবার এই কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন, দেশে এ ধরনের কেন্দ্র আরও গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের ই ব্লকের দ্বিতীয় তলায় সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেনে (সিএনএসি) আলাদা একটি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রতি শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার (সরকারি ছুটির দিন বন্ধ) সকাল আটটা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে।
এখানে ভর্তি করা রোগীদের জন্য ডি ব্লকে ১০ শয্যার একটি ওয়ার্ড আছে। শয্যাস্বল্পতার কারণে অনেকে এখানে চিকিৎসা নিলেও ভর্তি হতে পারে না। এখানে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব শিশুর অবস্থা বেশি খারাপ, তাদের এখানে ভর্তি করা হয়। কিন্তু প্রতিদিন এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এখানে এসে ফিরে যায়। মিরপুরের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছেলের দুইটা পা অবশ। চলতে পারে না। এইখানে এত অল্প বেড, কত দিন ধইরা ঘুরতাছি। আমার পোলারে ভর্তি করাইতে পারি নাই।’
সিএনএসি প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক শাহীন আখতার বলেন, ‘আমরা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সচেতনতামূলক কাজ করছি। এখানে গড়ে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন প্রতিবন্ধী শিশু চিকিৎসা নিতে আসে।’ তিনি আরও জানান, ১৫ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে এখানে একটি স্কুলও আছে। সকাল নয়টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এই স্কুল চলে। অত্যন্ত স্বল্প খরচে এখানে শিশুদের চিকিৎসা করানো হয় এবং স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
হাসপাতালটিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা না থাকার কথা স্বীকার করে শাহীন আখতার বলেন, ‘আমরা একটি আলাদা ইনস্টিটিউট করার জন্য কাজ করছি। কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। সেটি চালু হলে সেখানে আরও বেশি শিশুকে চিকিৎসা ও শয্যা দেওয়া সম্ভব হবে।’
সূত্র - প্রথম আলো