কাচঘেরা ঘর। ভেতরে ছোট্ট একটি শিশু। তার নাকে খাবারের ও হাতে স্যালাইনের নল। কাচের বাইরে থেকে দেখা যায়, শিশুটি কাঁদছে কিন্তু তার শব্দ আসছে না। যে ডায়াপারটি পরানো হয়েছে, তাতে ওই ছেলে শিশুটির প্রায় অর্ধেক শরীর ঢেকে গেছে। এভাবেই রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের শিন শিন জাপান হাসপাতালের একটি কক্ষে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে শিশুটি।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি গ্রামে ২ এপ্রিল জন্ম হয় শিশুটির। নির্ধারিত সময়ের চার সপ্তাহ আগেই জন্ম তার। বাচ্চাটির ওজন ৬৮৫ গ্রাম, উচ্চতা ১৩ ইঞ্চি। তার হাত-পাগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক গুণ ছোট। মাথায় বড় ও ঘন চুল আছে। তবে ফুটফুটে এই বাচ্চাটি শঙ্কামুক্ত কি না, এখনো নিশ্চিত নন চিকিত্সকেরা। তবে আর পাঁচ দিন পর হয়তো শিশুটির অবস্থা বোঝা যাবে। চিকিত্সকদের ভাষ্য, শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি (কমপক্ষে মাস খানেক) চিকিত্সার প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের শিক্ষক ও হেলপিং বেবিজ ব্রিদ কর্মসূচির প্রধান প্রশিক্ষক সঞ্জয় কুমার দে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ দেশে ৭০০ গ্রামের চেয়ে কম ওজনের শিশু বেঁচে থাকার নজির আমার জানা মতে নেই। তবে বাংলাদেশে ৫০০ গ্রাম ওজনের শিশুও জন্ম নিয়েছে।’
উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে ৬৮৫ গ্রাম ওজনের শিশুটির চিকিত্সায় প্রতিদিনই খরচ হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। তবে শিশুটির এই চিকিত্সা-ব্যয় মেটানোর সাধ্য নেই কৃষক বাবা কামাল হোসেনের।
আজ শনিবার হাসপাতালে চিকিত্সার ব্যাপারে জানতে চাইলেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাচ্চাটির বাবা কামাল হোসেন বলেন, ‘বাসার খাট বিক্রি করে হাসপাতালে সাত হাজার টাকা দিয়েছি। জানি না এখন আর কীভাবে বাচ্চাটিকে বাঁচাব।’
সিন সিন জাপান হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চাটির চিকিত্সার খরচ যদি কেউ দেয়, তাহলে খুব ভালো হতো। তবে বাচ্চাটিকে বাঁচানোর জন্য যত দিন প্রয়োজন তত দিনই আমরা আমাদের পক্ষ থেকে চিকিত্সা করিয়ে যাব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছিলাম গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বাচ্চাটিকে কবিরাজি চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তখন নিজেদের উদ্যোগে তার মাকে এখানে নিয়ে এসে ভর্তি করানো হয়। বাচ্চাটিকে এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।’
বাচ্চাটির মা খালেদা আক্তার বলেন, এর আগেও তাঁর দুটি বাচ্চা গর্ভাবস্থায়ই মারা গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘নানা মাইনসে নানা ধরনের চিকিত্সা করাইছে আমারে। ডাক্তারের কাছে আগে যাই নাই। এইবারই প্রথম আইছি এই হাসপাতালে। একবার বাংলাদেশ মেডিকেলে গেছিলাম ধানমন্ডিতে। তারা ওখানে রাখে নাই। কবিরাজরাই আমার চিকিত্সা করছে।’
বাচ্চাটির চিকিত্সক মিনহাজুর রহমান ও সোহরাব হোসেন জানান, শিশুটির বাবা-মা খুব একটা শিক্ষিত না। এ কারণে ভুল চিকিত্সায় মায়ের পেটে বাচ্চাটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়নি।
চিকিত্সক মিনহাজ বলেন, বাচ্চাটিকে এখন ইনকিউবিউটরে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়েছে। স্যালাইন ও অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। বাচ্চাটির সুস্থ তার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে চিকিত্সা প্রয়োজন। এ ছাড়া কিছু নিয়ম-কানুনও মেনে চলতে হবে। বাচ্চাটি এখন অনেকটাই সুস্থ, তবে শঙ্কামুক্ত নয়।
সূত্র - প্রথম আলো

