‘এক ভাগা দশ, এক ভাগা নেন দশ টেকা’। এভাবে এক কিশোরী ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। ওর সামনে রয়েছে ভাগ ভাগ করে রাখা পেঁয়াজ আর আদা। সেগুলোই বিক্রি করছে।
কারওয়ান বাজারের সবজি বাজারে পাইকারি, খুচরা বিক্রির রমরমা আসরে কিছু হতদরিদ্র বিক্রেতাও রোজগারের চেষ্টায় বসে। এই কিশোরী তাদেরই একজন। ২০ মার্চ বিকেলে কথা হলো ওর সঙ্গে।
নাম কী জিজ্ঞেস করতেই মিষ্টি হেসে বলল, ‘আলেয়া’।
বয়স সবে ১৩ পেরিয়েছে। কিন্তু অপুষ্ট শরীরে ক্লান্তির চিহ্ন বেশ স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। কথায় কথায় আলেয়া জানায় তার বৃত্তান্ত। ওর মা আম্বিয়া বেগম ভাগা সবজি বিক্রি করেন। বিভিন্ন সবজির দোকানে ঘুরে ঘুরে প্রায় নষ্ট বা থেঁতলানো, কিছুটা অচল তরিতরকারি জোগাড় করেন। কখনো নামমাত্র দামে, আবার কখনো এমনি এমনি। সেগুলোই ভাগে ভাগে সাজিয়ে বসেন বাজারের কোনো একটা কোণে। সেই তরকারি বিক্রি করেই ওদের পাঁচজনের সংসার চলে।
জানতে চাই, ‘পাঁচজন কে কে?’
‘আমি, আমার বইন-ভাই, মা আর নানা।’
‘তোমার বাবা কোথায়?’
চোখটা একটু নামায় এবার। ‘মইর্যা গেছে। মায় আর নানায়-ই তো সংসার চালায়।’
‘তবে, তুমি বিক্রি করছ কেন?’
‘নানায় নমাজ পড়তে গেছে আমারে বসায়া রাইখ্যা। তয়, মাঝেমইধ্যে আমিও বিক্রি করি। কিন্তু যখন ইশকুলে যাই, তহন তো বসতে পারি না।’
‘কোন স্কুলে পড়ো?’
হাত উঁচিয়ে বাজারের দোতলাটা দেখিয়ে দেয়, ‘ওইখানে আমগো একটা ইশকুল আছে। সেইখানে।’
কথা বলতে বলতেই ওর নানা চলে আসেন। আলেয়ার ছুটি মেলে। ওকে নিয়ে দেখতে চললাম ওর স্কুল। কারওয়ান বাজারের দোতলার চটের বস্তার ভিড়ের এক কোণে একটু জায়গা খালি পড়ে আছে। সেই জায়গাটা দেখিয়ে বলে, ‘এইখানে আমাদের ইশকুল বসে। দুপুর একটা থেইক্যা পাঁচটা পর্যন্ত পড়ি।’
‘স্কুলের নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?’
‘শিশু তরী এনজিও’ স্পষ্ট উচ্চারণে নামটা বলে। ‘আর এইখানে তো কোনো ওয়ান-টু কেলাস নাই। আমরা এখানে খালি নাম লিখা, বাংলা-ইংরাজি লিখি।’
আলেয়া কথায় কথায় আরও জানায়, এই এনজিও মূলত বস্তি বা পথশিশুদের অক্ষরজ্ঞান, তারও পরে কিছুটা বাক্য লিখতে শেখায়। পড়ার মেয়াদ এক থেকে দেড় বছর। এর মধ্যে শিখে ফেললেই ইস্তফা দেয় স্কুল থেকে।
হঠাৎই চোখে পড়ল ওর ডান হাতের কবজির নিচ থেকে হাতটা নেই। এতক্ষণ খুব সাবধানে ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীভাবে কেটেছে? জন্ম থেকেই?’
দুই দিকে মাথা নাড়ে। তারপর ধীরকণ্ঠে বলে, ‘ছোটবেলায় যখন পরথম ঢাকা আইছি, তহন। তিন-চারই বছর হইব। রেললাইনের ওপর দৌড়াইতাছিলাম। হঠাৎ একটা ট্রেন আইয়্যা পড়ল, মাথায় বাড়ি খাইয়্যা পইড়া গেছিলাম। আর ট্রেনের চাকা হাতের ওপর দিয়া গেছে। পরে সবাই হাসপাতালে লইয়্যা গেছিল।’ খানিক থেমে বলে, ‘তয় এইগুলা আমি মার মুখ থাইক্যা শুনছি বড় হইয়া।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সকালে কী খেয়েছ?’
‘ভাত খাইছি, আলুর তরকারি দিয়া।’
‘আর দুপুরে?’
‘দুপুরেও হেইটাই খাইছি। মায় তো কামে আইসা পড়ে। তহন আর রান্ধে না। তয় রাইতে মনে হয় পাঙাশ মাছ রানব।’ ওর ক্লান্ত চোখ হঠাৎ চকচক করে ওঠে।
‘এই বয়সে তো দুধ, ডিম, মাংস এগুলো খাওয়া দরকার। না হলে পুষ্টি হবে না।’
‘পুষ্টির কথা কী কন বুজি না। মাংস খাই দুই/তিন মাস পরে। আসলে আপা, আমরা তো টোকায়্যা-বিচরাইয়্যা খাই, ডিম-মাংস পামু কই! তয় মাঝেমইধ্যে টেকা থাকলে হেইগুলা কিনে। তহন সবাই মিল্লা খাই।’
তারপর প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে, ‘তয় আপা, দুধ খাইতে খুব মন চায়, খুব স্বাদের খাওন! কবে যে খাইছি, মনে নাই।’
সূত্র - প্রথম আলো

